Home / ফেইসবুক কর্নার / সাহসের ডানায় ঝাপিয়ে পড়া

সাহসের ডানায় ঝাপিয়ে পড়া

প্রদীপ বাগচী

প্রদীপ বাকচী : আমার মা পার্থিব শিক্ষায় কতটুকু শিক্ষিত ছিলেন,আমার জানা নেই।তবে লেখাপড়ার স্বীকৃতি স্বরূপ কোন সনদ ছিল না,সে কথা সত্য। তবে সত্যবাদিতা ও সাহসিকতায় ছিলেন প্রোজ্বল।শূন্য হাতে অজস্র পিছুটানে কিভাবে সামনে যেতে হয় তা জানতেন।আমাদেরও শিখাতেন সেই সব।সীমাহীন না পাওয়ার মাঝেও কিভাবে প্রত্যাশার স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালিয়ে ,গভীর অন্ধকারে পথ চলতে হয়। আজ মধ্য বয়সে এসেও মনে হয় মায়ের সেই দূরদর্শিতা আর সাহসের দৃঢ়তার কাছে আমি কতই না তুচ্ছ!সার্টিফিকেট ঘিরে আছে চারপাশ আমার,অথচ কতই না দুর্বল চিত্তের আমি।

মনে পড়ে আজ প্রাণতুল্য ছোট ভাইয়ের সেই আবদারের কথা।১৯৯৮ সাল।দুই বছরও হয় নি চাকুরীতে যোগ দিয়েছি।বড় ভাই বিয়ে করেছে। সরকারী একটা চাকুরীও করে তবে সীমিত আয়ে তার জীবন। বাবা অবসরে গেছেন প্রায় দশ বছর হবে। জমির সামান্য ফসল আর আমাদের দুই ভাইয়ের আয়ে আর বাবার সামন্য কিছু পেনশনে সমনে এগিয়ে চলে সংসার।হাল ধরে আছে দৃঢ় চিত্তে মা আমার। বাবা তার সহযোদ্ধা। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট বোন আর ছোট ভাই থাকে আমারই সাথে।

এইচ,এস,সি পাশ করার পর ছোট ভাইয়ের ইচ্ছা হয়,বি,বি,এ এবং এম,বি,এ করতে যাবে ব্যাঙ্গালোর।ওর নাম উত্তম পারিবারিকভাবে ডাকি বিভু বলে।ছেলে বেলা থেকেই ওকে এতই ভালবাসি,মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনের চেয়েও বেশী।কোলে পিঠেই বড় হয়েছে আমার।আমার একটা খেলার পুতুলই ছিল ও। ওর কোন চাওয়া অপূর্ণ হলে আজও বুক ভেঙ্গে আসে।সেই বিভুর শখ ব্যাঙ্গালোরে পড়তে যাবে! খোঁজ নিয়ে জানি,ছয় মাস পর পর সর্ব সাকুল্যে দিতে হবে প্রায় পঞ্চাশ হাজার।অথচ মাসিক বেতন তখন পাই মোটে তিন হাজার।দাদারও প্রায় সমদশা।আর যা পাই তা দু চারটা ছাত্র পড়িয়ে।বুক ভেঙ্গে আসে অন্তরে আমার। স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় পাছে কষ্ট পাবে বিভু।কোন দিকে যাব,কি দিব সান্ত্বনা ওকে,এই স্বপ্ন ভঙ্গের দোলাচালে? চিন্তা করি একা একা,মার সাথে কথা বলি।বাড়ী যাই।মার কাছে সব খুলে বলি।সব শুনে মা সায় দেন,পাশে আছি তোর এগিয়ে যা সামনে।কোন ভয় নেই ,ইশ্বর পথ দেখাবে তোকে।সাহসে ভর দিয়ে চল,বিশ্বাস রাখিস ইশ্বরে,কোন বিপদ আটকাবে না তোকে।সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই ভাই বোন মিলে বাবা ময়ের সাথে।বিভু পড়বে বাঙ্গালোরে গিয়ে।ভাইবোন সকলে মিলে একসাথে যতটুকু সামর্থ্য যাহার দিয়েছে হাত বাড়িয়ে। বিভু পড়েছে ব্যাঙ্গালোরে,হয়েছে পূরণ মনবাঞ্ছা ওর। আজ আমেরিকার সিটিজেন হয়ে নিউ ইয়র্কের পুলিশ অফিসার হয়ে সুখে আছে,প্রিয় বধু শান্তি আর সন্তান আরিয়ান কে সাথে নিয়ে।

সাত বছরের কঠোর শ্রম আর চেষ্টার পথে মাঝে যুক্ত হয় সদা হাস্যময়ী জীবনের সাথী প্রতিভাময়ী, আমার বধু।দাম্গত্যের শুরুতে কঠোর অর্থ কষ্টের মাঝে পাশে দাঁড়িয়েছে দৃঢ় চিত্তে হাসি মুখে নিজ আত্মসুখ জলাঞ্জলি দিয়ে।

আজ মা পৃথিবীতে নেই নশ্বর দেহে।চলে গেছেন বার বছর আগে আজকের এই দিনে।

এখনও দু:সময় নেমে আসে মাঝে মাঝে জীবনে আমার।সেই দু:সময় কালে চারদিক যখন ঘিরে আসে গভীর অন্ধকার।মায়ের সেই অমোঘ বাণী,সাহসে ভর দিয়ে এগিয়ে যা সামনে,ইশ্বর তোকে পথ দেখাবে, জ্বেলে দেয় অন্তরে আমার প্রদীপের আলো,সেই ঘোর অমানিশার কালে।

প্রদীপ বাগচী
মানিক নগর,ঢাকা।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

032

“যাপিত জীবনে কড়চা” বইটি আমি সম্পূর্ণ পড়তে পারিনি

হাফিজুর রহমান : আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় অতিঃ উপ-পুলিশ কমিশনার জনাব ইফতেখায়রুল ইসলাম স্যারের এবারের ...