Home / লেখক / “সমাজ,সভ্যতা,সংস্কৃতি বনাম আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব”

“সমাজ,সভ্যতা,সংস্কৃতি বনাম আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব”

nilima sarkar

যখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে গোটা বিশ্ব! সহজ, নিপুণ ও তড়িৎ গতিতে সম্পাদন হচ্ছে আমাদের অফিসিয়াল, মার্কেটিং,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবংকি কৃষি ও গৃহস্থালীর যাবতীয় কাজ।
মহাকাশের বার্তা প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় মুহূর্তে মুহূর্তে ! তখন এটা অবশ্যই খুশির ব্যাপার!
কিন্তু যখন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারে একে একে দখল করে নিচ্ছে মানুষের ইচ্ছা আকাঙখাগুলো,দখল করে নিচ্ছে মন ও মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন! যখন ছেয়ে আছে একছত্র আধিপত্যে সমস্ত অস্তিত্বে!
তখন অপর দিকে নিঃশ্বেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ,সংস্কৃতি, সভ্যতা!
প্রযুক্তির প্রভাবে বহিঃর্বিশ্বে লক্ষনীয় উন্নতি থাকলেও হুমকীর সম্মুখীন আমাদের বাংলাদেশের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি।
এখন মানুষগুলো রোবট এর মতই চলছে।
শিশু, কিশোর বা যুবকই নয়! নেতিবাচক প্রভাব অবিভাবকদের ছেড়ে যাচ্ছেনা!
সেকালের মা, খালা,নানী,দাদী,ফুপু,চাচী কিংবা বাবা,চাচা,মামা, নানা, দাদাদের অঢেল সময় ছিলো ছেলেমেয়েদের সাথে গল্প বলার, সেগুলো বাস্তব হোক আর রুপকথাই হোক! সব গল্পের মাঝেই থাকতো বিনোদন সহ শিক্ষনীয় উপমা! ছোটোদের/বড়দের সকালে পাখীর ডাকে ঘুম ভাঙতো! নয়তো বড়দের ধর্মীয়গ্রন্থ পড়ার সুমধুর আওয়াজে ঘুম ভাঙতো!
ঘুমিয়ে পড়ার আগমুহূর্তের কথোপকথন হতো পাশে শুয়ে থাকা মা, বাবা, নানী,দাদী, স্বামী, স্ত্রী, কিংবা পরিবারের অন্য আপনজনদের সাথে।
এখন ঘুম থেকে উঠে যেমন প্রথম লক্ষটা মোবাইল! তেমনি ঘুমানোর আগের শেষ সঙ্গটাও মোবাইল।
এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি সুযোগ করে দিয়েছে পরিবারে অন্যান্ন সদস্যদের চেয়ে ফেসবুক পরিবারকে গুরুত্ব দিতে!
ছেলে মেয়েদের সাথে সাথে অবিভাবকগন ও ব্যাস্ত ফেসবুক, টিভি সিরিয়াল, মুভি ও গেম নিয়ে!
বেশি বেশি নাম্বার তুলে প্রথমের চেয়ে প্রথম করতে বাচ্চাদের উপর পড়ালেখার কষুনি! কিন্তু সেই পড়ালেখা থেকে বাচ্চারা নিজের চরিত্র গঠনে কতটুকু কি অর্জন করছে সেই দিকে মোটেও খেয়াল করার সময় নেই বাচ্চাদের মা বাবার!
মোবাইল ফোনে কিংবা ল্যাপটপে চোখ গুঁজে বাচ্চাদের কথার প্রতিত্তর হচ্ছে-না, হ্যাঁ কিংবা হুঁ তে! কিন্তু কেন না,হ্যাঁ,হুম তার ব্যাখ্যা বাচ্চারা পাচ্ছেনা।
সোজা সাপটা- সত্য কথা বলো, সৎ পথে চলো, পূজা পার্বণ করো, নামাজ রোজা করো, কুরান গীতা পড়ো! পর্দা করো, কিন্তু অসৎ হলে কি হয়, সৎ থাকলে কি পায়,পূজা পার্বণ করবে কেন, নামাজ রোজা করবে কেন, গীতা, কুরান,বাইবেল পড়বে কেন,পর্দা না করলে কি হয়! পর্দা করলে কি হয় তার মর্মকথা ব্যাখা করার মত সময় ও ধৈর্য্য ডিজিটাল অবিভাবকদের নেই!
আর তাই সমাজে অপরাধ প্রবণতা ক্রমশ মহামারী আকার ধারণ করছে।
অবিভাবকের চাপিয়ে দেওয়া পর্দা ক্ষুন্ন হচ্ছে লাঞ্চিত হচ্ছে অবিভাবকের অগোচরে।
সাম্প্রদায়ীকতায় নষ্ট হচ্ছে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি!
পিতা মাতার চোখ ফাঁকি দিয়ে দশ পাঁচটা ছেলে মেয়ের সাথে ডেটিং করা একটা স্মার্টনেস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাঁচ দশটা ব্রেকাপ আর পাঁচদশটা রিলেশয়ান না হলে এ যুগে স্মার্টই হওয়া যায়না!
এই সমস্ত ছেলে মেয়েদের মনে যদি ঈশ্বর / আল্লাহ ভীতি ও প্রীতি তৈরী করা যেতো তাহলে অন্তত একটা পাপ করতে গিয়ে পাঁচবার স্বরণে আসতো-
এমন একজন আছে সর্বস্থানে,
কেউ না জানলেও তিনি জানে।

আমি বুঝিনা কিভাবে একজন বাঙালী পিতা মাতা তাদের মেয়েদের এমন পোশাক পরার সুযোগ দেয় যে তাতে মেয়েদের নগ্ন দেখায়?
বিধাতাই জানেন কার জন্য স্বর্গ আর কার জন্য নরক বরাদ্দ রেখেছেন! আর তাই এটা ভাবার কোনোই কারণ নেই যে পাপের ঘড়া পূর্ন হবার পর স্বর্গে যাওয়ার জন্য মরার আগের দিনগুলো ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়ে পাপ কাজ ছেড়ে দিয়ে ধর্ম কর্ম করলেই চলবে।
এই আমেরিকায় এমনও বাঙালী পরিবারের মেয়ে আছে যারা বাসা থেকে হিজাব ও সভ্য পোশাক পড়ে বের হলেও স্কুল, কলেজে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে অর্ধনগ্ন পোশাক পড়ে নিচ্ছে।
সাবওয়েতে গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড অত্যান্ত আপত্তিকর অবস্থায় দৃশ্যমান দেখে ইচ্ছে করে বাম হাতে কানটা ধরে ডান হাত দিয়ে গালে একটা কষে চড় মারি, আর টেনে হিঁচড়ে ওদের বাবা মায়ের সামনে নিয়ে দেখাই যে তাদের অর্থ উপার্জনের নেশাগ্রস্ত যান্ত্রিক জীবনের প্রভাবে আর ওভার কনফিডেন্স কিংবা অবহেলাপূর্ণ শিক্ষায় সমগ্র বাঙালী সভ্যতা কিভাবে নষ্ট হচ্ছে।
একটা নষ্ট চরিত্র আরো দশটা ইনোসেন্ট চরিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে।

সেই শিক্ষা কি এখনো আছে যে – পাপ শুধুই দেহের নয়! তা মনেরো বটে!
পাপ শুধু যে করে তারই নয়! যে করায় তার ও বটে!
আমি জানিনা আমাদের সময়ের বাবা মায়ের মত এখনকার বাবা মায়েরা এটা ভাবেন কিনা যে সন্তান পাপ পথে গেলে তার খানিকটা দায় পিতামাতার ও নিতে হয়! শুধু প্রবাসের কথাই বলছিনা!
বাংলাদেশের মায়েদের ফেসবুকে তাদের মেয়েদের যে সমস্ত পোশাকে ছবি পোষ্ট করা দেখি তাতে ওয়েষ্টার্ন হার মানে!
আধুনীক প্রযুক্তির অপব্যাবহারের কূফলে বাঙালী সভ্যতা, সংস্কৃতি চরমভাবে হুমকীর সম্মুখীন!
এখনো সময় আছে অলস ঘুমন্ত নির্জিব নেশাগ্রস্ত সত্বাকে জাগিয়ে তুলুন! চেতনায় ফিরে আসুন! আজ থেকে পরবর্তী প্রজন্মরা আপনার রক্তই বহন করবে, তাদের মাঝে আপনি বাস করবেন, তারা যেনো আপনার পরিচয় বহন করতে সঠিক বাহক হয় সেজন্য প্রস্তুত করুন তাদেরকে! আপনি একজন যোগ্য মানুষ গড়ে দিতে পারলে সেই যোগ্য মানুষ পারবে আরেকটি যোগ্য প্রজন্ম গড়তে এভাবেই সভ্যতা, সংস্কৃতি বয়ে নিয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে!
আপনি নিশ্চয় চাইবেন আপনার আভিজাত্য আপনার উত্তরসুরীরা রক্ষা করে চলবে!
তাহলে সন্তানের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসে চোখ কান বন্ধ রাখবেননা।
আপনার সন্তান বাসা থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে বাসায় ফেরা পর্যন্ত সে বিশুদ্ধ পথে আছে তো?
যখন আপনারা স্বামী স্ত্রী দুজনেই কর্মস্থলে, তখন আপনার বাসায় আপনার ছেলেটি অথবা আপনার মেয়েটি তার মেয়ে বন্ধু বা ছেলে বন্ধুকে বাসায় ডেকে কোনো অসামাজিকতায় লিপ্ত হচ্ছেনাতো?
আপনার ছেলেটি বা আপনার মেয়েটি নাইট শিফট কাজের কথা বলে কোনো পুরুষ বন্ধু কিংবা মেয়ে বন্ধুদের সাথে আপনার মত বিরুদ্ধভাবে চলাফেরা করছে নাতো?
আপনার মেয়েকে যেভাবে হিজাব বোরকা অথবা শালীন পোশাক পড়িয়ে স্কুল কিংবা কলেজের উদ্দেশ্যে বিদায় দিলেন, সে বাসায় ফেরার আগ পর্যন্ত সেই পোশাক ও পোশাকের মর্যাদা রাখছে তো?
আসুন আমাদের সন্তানদের বলি ওটা ওদের ধর্ম,ওদের সংস্কৃতি, ওদের সভ্যতা, তাই ওটা আমরা অনুকরণ করবোনা!
আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধশালী! আমরা আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতি রক্ষা করে চলবো! আর এটাই আমাদের অহঙ্কার!

আমরা বাঙালি! বাঙালি সংস্কৃতি সভ্যতা আমাদের অহংকার!
আসুন আমরা আমাদের মন ও মস্তিষ্কের সমস্তটা প্রযুক্তিকে না দিয়ে আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতি রক্ষায় কিছুটা স্পেস আমাদের প্রজন্ম পরিচর্যার জন্য রাখি!

লেখক: নীলিমা সরকার।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

Lion Gani Miah babul

আমার বাবা আমার প্রেরণা ও শক্তির উৎস

আমার বাবা মোঃ ইসমাইল হোসেন। তিনি শুধু আমার জন্মদাতা নন, আমার আদর্শেরও প্রতীক। তিনি আমার ...