Home / Breaking News / ভাবনা ক্লাব সিলেটে ৫-৬

ভাবনা ক্লাব সিলেটে ৫-৬

ডন

আজিজুস সামাদ ডন: (পূর্ব প্রকাশের পর)

সঞ্চালক গেম থিয়োরী নিয়ে কথা বলছেন, প্রতিযোগীতা মূলক গেম থিয়োরীর সূত্র অনুযায়ী চারটি অপশন্স দেয়া হল, যেখানে একটি অপশনে রয়েছে পুরষ্কারের ব্যবস্থা; যেহেতু অপরাধী দু’জনের একে অপরের প্রতি আস্থা নেই, সুতরাং, ৯৯% সম্ভবনা তারা দু’জনেই দোষ স্বীকারে করবে এবং দু’জনেই পাঁচ বছরের জেল খাটবে।

গেম থিয়োরির দ্বিতীয় ভাগ, অর্থাৎ, সহযোগীতা মূলক গেম থিয়োরীকে বোঝার সুবিধার জন্য এখানেও দু’জনকে টেনে আনি; ধরে নেই এই দু’জন মানুষের মূল জীবিকা হল বিস্কুট বানিয়ে বিক্রি করা, তাদের একজন দিনে দশটি বিস্কুট তৈরী করতে পারে, আরেকজন বিশটি বিস্কুট তৈরী করতে পারে, অর্থাৎ, দু’জনের সম্মিলিত বিস্কুট তৈরীর সক্ষমতা দিনে ত্রিশটি; কিন্ত দেখা গেল, দু’জন যখন এক হয়ে বিস্কুট তৈরী করা শুরু করে, তখন তারা ত্রিশটির যায়গায় চল্লিশটি বিস্কুট তৈরী করতে পারে; দু’জনের মাঝে লভ্যাংশ ভাগ করবে এখন কি ভাবে; থিয়োরী হল, সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারনে যেটুকু বেশী বিস্কূট তৈরী হল তার অর্ধেক দু’জনে ভাগ করে নেবে, অর্থাৎ, এখানে প্রথম জন পাবে ১৫টি বিস্কুটের লভ্যাংশ, দ্বিতীয়জন পাবে ২৫টি বিস্কুটের লভ্যাংশ।

রাজনীতিবিদ বললেন, আপনি বললেন বিরোধী দলীর গল্প শোনাবেন কিন্ত এখানে বিরোধী দল কোথায়।
সঞ্চালক বললেন, আমাদের ক্যামেরাম্যান ভাই একটু আগেই বলেছেন, মানুষ সামাজিক প্রানী, সমাজ চিন্তা মানেই রাজনৈতিক চিন্তা; এটাও সমাজ চিন্তা, সুতরাং, আমরা ধরেই নিতে পারি এখানে রাজনীতি আছে; প্রতিযোগীতা মূলক গেম থিয়োরি অনুযায়ী নিজেদের মাঝে একে অপরের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস না থাকার কারনে বিরোধীদল পরাজিত; আবার সহযোগিতা মূলক গেম থিয়োরী, অর্থাৎ, বিস্কুট ভাগাভাগির থিয়োরীতেও বিরোধী দল পরাজিত; বিরোধীদল যতই বলুক তাদের দাঁড়াবারই সুযোগ দেয়া হয়নি, তাদের আগে বুঝতে হবে, পৃথিবীর সকল দেশেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে না দাঁড়াতে দেবার বন্দোবস্ত করার জন্য।

রাজনীতিবিদ বললেন, আপনি তো বিস্কুট আর কারাবন্দীর অলীক উদাহরণ দিলেন, আমাদের দেশের বাইরের একটা উদাহরণ দেন তো দেখি।
সঞ্চালক বললেন, আমাদেরে দেশই বা বাদ যাবে কেন; যারা এখন এসব অদ্ভুত কথাবার্তা বলছে, ২০০১-০৬ পর্যন্ত তারাই সবচেয়ে নোংড়া ভাবে এর প্রয়োগ করেছে; দেশের বাইরের উদাহরণ চাইলেও হাজারে হাজারে দিতে পারবো; যেমন, সহযোগিতা মূলক গেম থিয়োরির উদাহরণ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বহুল ব্যবহৃত; যত আঞ্চলিক জোট দেখা যায় তার সবই এই থিয়োরীকে মেনেই করে, যেমন চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড; তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের গত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথাই ধরা যাক; প্রথমে হিলারী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক’শো অভিযোগ এনেছেন, ঐ এক’শো অভিযোগের মাঝে দশটি অভিযোগে হয়তো মিথ্যা বা ভুল তথ্য ছিল; ট্রাম্প তখন শুধু ব্যস্ত থাকতেন ঐ দশটা মিথ্যা অভিযোগকে মিথ্যা বলার জন্য; পরবর্তিতে ট্রাম্প তার স্ট্র্যাটেজি বদলালেন; হিলারীর বিরুদ্ধে হাজারো আবোল তাবোল মিথ্যা বলা শুরু করলেন, এখন পাশার দান উলটে গেল; হিলারী আর কি অভিযোগ করবেন আর কি প্রচারনা চালাবেন, ট্রাম্পের মিথ্যা গুলো ক্ষণ্ডন করতে করতেই দিন শেষ এবং অবশেষে তার পরাজয়।

জমিদার নন্দন আর থাকতে পারলো না। তিড়িং করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলা শুরু করলো, ঠিক কথা ঠিক কথা, একদম ঠিক কথা; ভাই, উকিলেরা এই কাজই করে; আমার প্র্যাকটিকাল অভিজ্ঞতা আছে; একজন উকিল যখন কোন মামলা নেয় তখন বেশীরভাগ সময় জেনেই মামলা নেয় যে, সে সত্যের পক্ষে লড়াই করছে নাকি মিথ্যার পক্ষ নিয়ে আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করছে; যদি সে মিথ্যা মামলা নিয়া থাকে তাইলে করে কি জানেন? শুরু করে প্রতিপক্ষ বাদী বা বিবাদীর ওপর আক্রমন; আজেবাজে মিথ্যা দিয়া এক্কেবারে আষ্ঠেপৃষ্ঠে প্যাঁচাইয়া ফেলায়, আপনার থিয়োরীর সাথে একদম হুবাহুব মিল আছে ভাই।

সঞ্চালক বললেন, দিলেন তো থিয়োরীর বারোটা বাজাইয়া; আরে ভাই, উদাহরণকে থিয়োরীর সাথে মিলালে তো কখনোই থিয়োরীর পক্ষে কোন বিশ্বাস যোগ্য সূত্র দাঁড় করাতে পারবেন না; এইখানে উদাহরণটা আপনার অভিজ্ঞতার সাপোর্টে কথা বলছে, থিওরী না; এই ক্ষেত্রে আপনার উল্লেখিত উকিল যেহেতু জানে যে, হারাবার তার কিছু নেই, তাই যে কোন মূহুর্তে সকলের সামনে সে তার নিজের জামা কাপড় খুলে ফেলতে পারে; এই আক্রমনাত্নক চড়াও হবার মূল তত্ব কথা হল, সে জানে যে সে নিজে সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না; সে আক্রমত্নক কথা বলা শুরু করলে প্রতিপক্ষের প্রথম কাজই হয়ে দাঁড়াবে আত্নরক্ষা মূলক অবস্থান নেয়া।

ভাবনা ক্লাব সিলেটে-৬

রাজনীতিবিদ বললেন, সরকারি দল গেম থিয়োরী না বুঝলেও থিয়োরীর উদাহরণটা বেশ ভালই বুঝেছে, হারাবার কিছু নেই বুঝে গনতন্ত্রের উপরই আক্রমন করে বসেছে।
সঞ্চালক বললেন, গনতন্ত্র নিয়ে আমরা বহুবার আলোচনা করেছি, আজ না হয় না করি।
রাজনীতিবিদ বললেন, কেন, আলাপ করতে ভয় পাচ্ছেন কেন, যুক্তি খুঁজে না পেলে আক্রমনাত্নক কথা বলা শুরু করবেন না হয়।

সঞ্চালক তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ভাই, আমার আজকে সময় কম, অতএব কথা বাড়াবেন না; আমরা শুধু ট্রাম্পের সাফল্যটা কোথায় সেটা বিবেচনায় নেই; ট্রাম্পের প্রচারনা টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি নিজে, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন খুব তাড়াতাড়ি, এক্সিকিউট করেছে তার প্রতি আস্থা আছে এমন একটি বিশ্বস্ত টীম; আমাদের তথাকথিত বিরোধীদলের ক্যাপ্টেন কে ছিল, সেই ক্যাপ্টেনের বিশ্বস্ত টীম মেম্বার কারা ছিল, সেটা তাদের নিজেদের কাছেই ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন; সুতরাং, গেম থিওরীর প্রতিযোগীতা এবং সহযোগীতা, দুই ভাগেই তারা চুড়ান্ত ব্যার্থ হবে এটাই সাভাবিক।

জমিদার নন্দন খুব খুশী মনে টেবিলে বিশাল এক থাপ্পড় মেরে দিয়ে বললেন, ঠিক কথা, রাইট কথা, ক্যাপ্টেন ছাড়া, টীম ছাড়া খেলতে নামছেন; লগে তো আছেই বর্তমান সরকারের উন্নয়ন চিত্র; আপনাদের বিপক্ষে ছিল নিকটাতীতের দূর্নীতি, অপশাসনের ভয়াবহ চিত্র, আর আন্দোলনের নামে শত শত মানুষ পোড়ানোর ইতিহাস; মানুষ ভোট দিতে যাবে কেন, এইটা নেগেটিভ বনাম পজেটিভের খেলা; পজেটিভের জয় হবেই।
রাজনীতিবিদ বললেন, এতোই যদি পজিটিভ থাকেন তাহলে সাধারন মানুষকে ভোটটা ঠিক মত দিতে দিলেই পারতেন।
জমিদার নন্দন বললো, দেয় নাই বুঝলেন কি কইরা; সারা পৃথিবীর তাবৎ দেশে কইছে সুন্দর ভোট হইছে, দেশী বিদেশী সব নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা কইছে ভাল নির্বাচন হইছে; আপনারা তো নালিশের এক্সপার্ট, প্রমান হাতে থাকলে তাগো দেখাইলেই পারতেন।

রাজনীতিবিদ বললেন, আমি ভাই সাদা চোখে যা দেখেছি সেটাই বলছি, আমার ভোটটা আমি দিতে পারি নাই।
সঞ্চালক বললেন, পরিসংখ্যানের খাতায় ব্যক্তি আপনার অবস্থান অতি নগন্য; সার্বিক ভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন সুসম্পন্ন হয়েছে।
রাজনীতিবিদ বললেন, আমি মানি না, আমার ভোট আমি দিতে পারলাম না আর আপনি বলছেন সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচন সুসম্পন্ন হয়েছে, গনতন্ত্র কোথায় গেল?

সঞ্চালক একটু রূঢ় স্বরেই বললেন, শোনেন রাজনীতিবিদ সাহেব, গনতন্ত্রের অর্থ যদি শুধু নিজের ভোট দিতে পারার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান তাহলে বলবো, সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে ছিয়ানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত এর চেয়েও মজার মজার গনতন্ত্র আমরা দেখেছি, মাগুরা নির্বাচনও দেখেছি; নব্বইয়ে ক’জনের টেলিভিশন ছিল আমাকে বলেন, অথচ ইলেকশনের আগের দিন টেলিভিশনে এমন কি বলা হয়েছিল যে, আপনারা ৯১’এর নির্বাচনের পরে প্রচার করা শুরু করলেন, ঐ এক বক্তৃতার কারনে তৎকালীন বিরোধী দল পরাজিত হয়েছে; সেসব নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচন শতগুনে ভাল হয়েছে; আপনার ভোট দিতে পারেননি বুঝলাম, সেটা তো সংসদীয় নির্বাচনের সৌন্দর্য; আমাদের দেশের গনতন্ত্রের ইতিহাসের পাতায় আমি অন্তত এক’শো উদাহরণ দিতে পারবো যেখানে একজন সংসদ সদস্য নিজেকে নিজে ভোট দিতে পারেননি, কারন, উনি যে এলাকায় নির্বাচন করছেন সে এলাকায় ওনার ভোট ছিল না; আপনার ভোট কোন এলাকায় ছিল আমার জানা নেই; গনতন্ত্রে একজন দিন মজুরের বা ভূমিহীন কৃষকের যেমন এক ভোট, আপনারও তেমন এক ভোট, আপনি ভোট দিতে পারেননি বলে পুরো নির্বাচন বা গনতন্ত্র অশুদ্ধ হয়ে যেতে পারে না।

রাজনীতিবিদ বললেন, তাহলে গনতন্ত্রের শুদ্ধতার আপনার সংজ্ঞা দেন, শুনে রাখি একটু।
সঞ্চালক বললেন, আমার সংজ্ঞা শুনবেন কেন, সার্বজনীন সংজ্ঞাই শোনাচ্ছি, শুনে রাখেন, কাজে আসবে। গনতন্ত্র একটা চর্চা; হঠাৎ করে গনতন্ত্র টুপ করে আপনার কোলে এসে পরবেনা; সেই চর্চার মূল দায়ীত্ব কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উপর; সেই প্রতিষ্ঠান গুলোর মাঝে রাজনৈতিক দল গুলো অন্যতম; আপনার দল কি জানতো না সামনে সংসদ নির্বাচন; আপনার দলের যে মাজা ভাঙ্গা সেটাও আপনার দলের জানা ছিল; তফসিল ঘোষনার দুই সপ্তাহ আগে আপনাদের হুশ হল যে, নির্বাচনে যেতে হবে; নেতৃত্ব দেবে কে? জানেন না; নীতিনির্ধারণী ফোরাম কারা? জানেন না; এতো অল্প সময়ের মাঝে জোড়া তালি দেয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ রাজনীতিবিদ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস নিয়ে আর যাই হোক একটি ইউনিট তৈরী করা যায়না।

(চলমান)

লেখক: প্রয়াত জাতীয় নেতা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের পুত্র আজিজুস সামাদ আজাদ ডন।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তামিম

তামিম ইকবালের জন্মদিন আজ

সংবাদ পরিক্রমা: তিনিই বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কিনা? তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে তামিম ...