Home / Breaking News / ভাবনা ক্লাব সিলেটে ৩ – ৪

ভাবনা ক্লাব সিলেটে ৩ – ৪

ডন

আজিজুস সামাদ ডন: (পূর্ব প্রকাশের পর) এরমাঝে কোন সময় রাজনিতিবিদ ভাই ঘরে ঢুকেছেন সেটা আমরা কেউ খেয়াল করিনি। উনি বলে উঠলেন, যা করতেছেন আপনারা, বিরোধী দলের মাজা ভাঙ্গার মত কাজ করবেন আর মাজা ভাঙ্গবেনা এটা কেমন কথা।

ইঞ্জিনিয়ার বললেন, নিজের মাজার শক্তি সম্পর্কে আন্দাজ নাই, মাজা তো ভাঙ্গবোই।

রাজনীতিবিদ খুব গম্ভীর গলায় বললেন, যে ধরনের রাজনৈতিক খেলা আপনারা দেখাইতেছেন সেটা এতই মোটা দাগে করতেছেন যে, খালি চোখেই স্পষ্ট ধরা পরে সাধারন মানুষের কাছে।
ইঞ্জিনিয়ার সব সময় নিজেকে সাধারন জনগনের প্রতিনিধি ভাবেন। কিন্ত আজ গর্দভেরও অধম বলাতেই কিনা জানিনা, নিজেকে আর এই আসরের জনগন ভাবতে পারলেন না। উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, রাখেন মিয়া আপনের জনগন। আপনেরা যখন আড়াই বছর কারফিউ দিয়া দ্যাশ শাসন করলেন তখন জনগনের কথা মনে আছিল না। হ্যা-না ভোট, ১৯৭৯ সালের অদ্ভুত সংসদ নির্বাচন দিয়া জনগনেরে বাইরে রাইখা ভোট কইরা বিরোধীদলের নাম নিশানা মুইছা দেওয়ার ব্যাবস্থা করলেন, তখন জনগন আছিল কই? স্বাধীনতা বিরোধীদের নিয়া সরকার গঠন, তাদের হাতে দেশের পতাকা দেওয়া, তাদেরকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানানো এইসব সময় জনগনের কথা তো ভুইলাই গেছিলেন। ৭৫ পরবর্তিতে অবৈধ ক্ষমতা নিয়া ইনডিমনিটি আইন কইরা খুনী গুলারে রাষ্ট্রের বড় বড় পদে চাকরি দিলেন আর যখন সারা দেশেরে জেলখানা বানাইলেন, ২০০১ সালে যখন আবার স্বাধীনতার পক্ষের সকলেরে গায়েব করা শুরু করলেন কিংবা গনতন্ত্রের মাজা ভাঙ্গছিলেন যখন ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তখন জনগন আছিল কই। আপনাদের স্বভাবই হইল সাদা কালো একটা বিষয় নিয়া রঙ্গের খেলা শুরু করেন কিন্ত সেটা আপনারা কোন দিন পারবেন না। একটা জেব্রার রঙ্গীন ছবি তুইলা আমারে দেখাইয়েন তো দেখি পারেন কিনা।

রাজনীতিবিদ বললেন, এই যে, আপনাদের স্বভাবখানাও দেখেন; কিছু হইলেই দৌড় মারেন ইতিহাসের কাছে; আরে ভাই, ইতিহাস অতীতের বিষয়; আমরা বর্তমান নিয়ে কথা বলছি।
সঞ্চালক মনে হল এইমাত্র তার ধ্যান ভেঙ্গে জেগে উঠে বসলেন, বললেন, শান্তি শান্তি। মিস্তরির সাংসারিক সমস্যা হইছে নাকি আজকে সকালে, অতো ক্ষিপ্ত কেন, এই ক্লাবে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ।

ক্যামেরাম্যান বললেন, ভাই, আপনার এই কথাটা সব সময়ই আমার খুব কানে লাগে, রাজনীতি মানেই হল মানুষের জন্য কিছু করা, আমরা মানুষ সামাজিক সংঘবদ্ধ প্রানী এবং সেটা অনন্তকালের ইতিহাসের পাতায় প্রমানিত, তার মানে আদি ও অন্তহীন ভাবেই মানুষ ও রাজনীতি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, আর এই ভাবনা ক্লাবে আমরা যে প্রসঙ্গের আলাপই করিনা কেন, মানুষ নিয়েই আলাপ করি, মানুষের জন্যই আলাপ করি। অতএব, আমাদের সব আলাপের মাঝেই রাজনীতি আছে। আপনি বরং বলতে পারেন, সরাসরি কোন রাজনৈতিক আলাপ করা যাবে না।
সঞ্চালক বললেন, আচ্ছা হইলো, আপনার কথাই রইলো। নো সরাসরি রাজনৈতিক আলাপ। রাজনীতিবিদ সাহেবরে বলে রাখি একটা কথা; ইতিহাস ছাড়া বর্তমান নেই ভবিষ্যতও নেই, আর যদি ফোর্থ ডাইমেনশনে যান তাহলে তো ভবিষ্যতও ইতিহাস হয়ে যাবে।

রাজনীতিবিদ বললেন, সেটা আবার কি ভাবে সম্ভব।
সঞ্চালক বললেন, কিভাবে সম্ভব সেটা সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা শুনতে চাইলে চলেন তাহলে আমাদের সাথে সিলেট; ওখানে লম্বা আলাপ হবে, এখন আমার কাজ আছে; এই অল্প সময়ে চতুর্মাত্রিক কোন আলাপ সম্ভব না বরং আমার গল্পটা বলে আমি বিদায় নেই; সিলেট থেকে এসে আগামী শনিবার বিস্তারিত আলাপ করবো।
জমিদার নন্দন বললেন, বলেন বলেন, আপনের বিরোধীদলীয় গল্প বলেন; আজকে আমরা যখন বিরোধীদল, আপনাদের কথা শুনে তীব্র প্রতিবাদ করবার ভাষা পেলে করবো সেই অনুমতি দিয়ে গল্প শুরু করেন।

সঞ্চালক বললেন, তীব্র প্রতিবাদ করবেন সেটার জন্যও অনুমতি নিয়ে রাখলেন, ভাল ভাল, খুব ভাল; আপনারা কেউ গেম থিয়োরীর গল্প শুনেছেন কি। আমাদের
ডাক্তার সাহেব থিয়োরী শব্দটা কোনখানে পেলেই বোধহয় সেটার ওপর একটু চোখ বুলিয়ে নেন, উনি বললেন, সে তো বিশাল থিওরী; গেম থিয়োরীর দুই ধারাকে এক করে আপনি এখন গল্প শুরু করলে তো অনেক সময় লাগবে।

সঞ্চালক সাহেব বেশ ধীর স্থির ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসতে বসতে বললেন, নাহ ডাক্তার সাহেব, ছোট করে ফেলবো, আমরা তো আর থিওরী নিয়ে কথা বলবো না।

ভাবনা ক্লাব সিলেটে-৪

আজ শুরু থেকে এক কাপ কফি, চা, সিঙ্গারা কিছুই আসেনি কিন্ত এই নিয়ে কেউ নালিশও করেনি। সকলেই হয়তো ক্লাবের সিলেট যাওয়ার বিভক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তিত। সেই চিন্তার কারনেই হোক আর অন্য যে কোন কারনেই হোক, থিওরী কপচানো হবে শুনে সকলের কপালেই চিন্তার একটা বলী রেখা ফুটে উঠলো এবং আরো অবাক করা বিষয় হল, নিজের অজান্তেই সকলে সঞ্চালকের দিকে একটু ঝুঁকে বসলেন যেন। এই অতি আগ্রহ বোধহয় সঞ্চালকের পছন্দ হলো না। সে বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো, আজকে মিস্ত্রী ব্যাটা নিজেকে শুধু গর্দভের অধম বলেই চহ্নিত করেনি, অসামাজিক জীব হিসেবেও চিহ্নিত করেছে।

ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের এমনিতেই আজ মন খারাপ। ক্লাবের জন্য একটা সুখবর নিয়ে এসে ক্লাবের বিভক্তি বোধহয় তার মনের গহীণে খোঁচা মারছিল সারাক্ষণ, যে কারনে চুপচাপ বসে ছিল। সঞ্চালকের এই কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো, আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে ফেলবো। কি পাইছেন আপনেরা; গর্দভ, অসামাজিক এইসব শব্দ আমার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার অর্থ হইলো আমাকে এই ক্লাব থেকে নিশ্চিহ্ন কইরা দেওয়া; এখন থাইক্কা আমার নামে কোন বিশেষন প্রয়োগ করতে হইলে আগে কারন দর্শাইতে হবে; নাইলে আমি হরতাল ডাকমু।
সঞ্চালক মহোদয় ইঞ্জিনিয়ারের রাগ বোধহয় খুব এঞ্জয় করছিলেন। ঠোঁটের কোনে একটা মিটিমিটি হাসি নিয়ে বললেন, অসামাজিক না হইলে আজকে এতক্ষণেও এককাপ কফি, চা, সিঙ্গারা কিছুই পাইলাম না কেন।

ইঞ্জিনিয়ার আর কথা না বাড়িয়ে বললেন, স্যরি স্যরি, আমার আসলে খুব মন খারাপ হইয়া গেছিলো; আমি যাই, কাম আছে কিছু; সিঙ্গারা-কফি পাঠাইতেছি; আর সিলেটের সাতটা টিকেটের মধ্যে একটা টিকেট ফেরত পাঠাইতেছি, যারা যারা যাইতে চান, ফ্লাইট টাইম সকাল দশটা, মঙ্গলবার; সকাল নয়টার মধ্যে সকলে এয়ারপোর্ট থাইকেন; সিলেটে যার গাড়ি আর থাকার বন্দোবস্ত করার কথা, কইরা রাইখেন; এই বয়সে, এই শীতের দিনে খোলা আকাশের তলায় ঘুমাইতে পারুম না।
ইঞ্জিনিয়ার বেরিয়ে যাবার পর সঞ্চালক খুব মোলায়েম স্বরে বললেন, ব্যাটা মিস্ত্রী আসলেই খুব ভাল মানুষ।
জমিদার নন্দন বললো, মানুষ ভাল না হইলে কি তার নিজের অফিসের একটা রুম ছাড়ে আর প্রতি শনিবারে আমাদের অত্যাচার সহ্য করে।

কথা অন্যদিকে প্যাঁচ খাবার আগেই সঞ্চালক বলা শুরু করলেন, ডাক্তার সাহেব তো গেম থিওরী সম্পর্কে ভালই জানেন। আর কে কে জানেন সে নিয়ে আর কথা বাড়াই না; গেম থিওরীকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, এক, প্রতিযোগীতা মূলক। দুই, সহযোগীতা মূলক; দুই ভাগই আবার মানুষের একে অপরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল।

সঞ্চালক বলে চলেছেন, প্রথমটার উদাহরণ হিসেবে যেটা বহুল ব্যবহৃত হয় সেটাকে বলে “কারাবন্দি পরিস্থিতি”; ধরেন দুজন মানুষ একটি অপরাধ মূলক কাজ করে ধরা পরলো; ঐ দু’জন মানুষের একে অপরের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস কম, কারন, অপরাধ সংগঠিত করবার আগে তাদের পরিচয় খুব বেশী দিনের নয়, অপরাধ করার জন্যই তারা ঘটনাচক্রে এক হয়েছে; ধরা পরবার পর আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হবে ধরে নেই দুই বছর, কিন্ত সংগঠিত অপরাধটি বিচারক মহোদয়ের খুব অপছন্দ; তিনি মনে মনে চান যে তাদের শাস্তি আরো বেশী হোক।

মহামান্য আদালত অপরাধী দুজন কে ডেকে পাঠালেন তার চেম্বারে, প্রস্তাব দিলেন, যদি তোমাদের একজন স্বীকার কর যে তোমরা অপরাধ করেছো, তাহলে যে ব্যক্তি স্বীকার করলো তাকে রাজ সাক্ষী হিসেবে মেনে নিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে, কিন্ত যে স্বীকার করলো না তাকে দশ বছরের জেল খাটতে হবে; আর দু’জনেই যদি স্বীকার কর তাহলে দুজনকেই পাঁচ বছরের জেল খাটতে হবে; আর কেউ যদি স্বীকার না কর তাহলে দু’জনকেই দুই বছরের জেল খাটতে হবে; আদালতের সময় বাঁচাতে এই সুযোগ তোমাদের দিলাম; এক ঘন্টার মধ্যে আমাকে জানাতে হবে। এই বলেই তিনি দুই অপরাধীকে আলাদা দুই রুমে নিয়ে একা একা রাখবার ব্যাবস্থা করলেন।

(চলমান)

লেখক: প্রয়াত জাতীয় নেতা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের পুত্র আজিজুস সামাদ আজাদ ডন।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তামিম

তামিম ইকবালের জন্মদিন আজ

সংবাদ পরিক্রমা: তিনিই বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কিনা? তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে তামিম ...