Home / Breaking News / নারীত্বের অহংকার

নারীত্বের অহংকার

অঞ্জনা দত্ত: আজ অনেকদিন বাদে সুনির্মলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল শপিং মলে রুম্পার৷ রুম্পা গিয়েছিল সংসারের জন্য টুকিটাকি কেনাকাটা করতে৷ এমনিতে কেনাকাটা কৌশিকই করে থাকে৷ রুম্পা কলেজ শেষে সাধারণত ঘরে ফিরে আসে। যতক্ষণ কলেজে থাকে কেমন যে হাঁসফাঁস করতে থাকে দেড় বৎসরের তিন্নির জন্য সে বলার নয়৷ একেকসময় ভাবে চাকরিটা ছেড়ে দেবে৷ কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে এ তার নিজের যোগ্যতায় অর্জন। কারও দয়ায় পাওয়া নয়৷ কত সময় কৌশিক শোনায় তোমার জন্য এই করেছি, ওই করেছি…. ভাগ্যিস কৌশিক বি সি এস দেয়নি৷ দিলে হয়তো বা বলতো ওর জন্যই রুম্পা বি সি এস পাশ করেছে। রুম্পার নিজের যোগ্যতা বলতে কিছুই নেই কৌশিকের দৃষ্টিতে৷ বাবা ছিলেন ছাপোষা একজন চাকুরে৷ রুম্পারা তিন বোন৷ তিনজনেই যেমন মেধাবী তেমনি সুন্দরী৷ এই দেশে এখনও মেধার চেয়ে পাত্রপক্ষের কাছে কনের রূপ প্রাধান্য পায় বেশি। তাই রুম্পাদের তিনবোনের বিয়ে দিতে বেশি বেগ পেতে হয়নি ওদের বাবার৷ রুম্পা ছিল সবার ছোট৷ ঢাবি থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেছিল৷ ইচ্ছে ছিল আরও পড়ার৷ পাত্রপক্ষ বিয়ের আগে কথা দিয়েছিল ওরা পড়াবে। কিন্তু বিয়ের পরে কৌশিক বেঁকে বসল। মাস্টার্স করেছে তো। আর কী দরকার? রুম্পার বড়বোন টুম্পা বিয়ের পর স্টেটসে যেয়ে পি এইচ ডি করে ওখানকার এক ভার্সিটিতে পড়াচ্ছে৷ মেজবোন ঝুম্পা দেশেই একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়াচ্ছে। দুই বোনের বর ডাক্তার৷ আর কৌশিক পারিবারিক ব্যবসার সাথে জড়িত। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান৷ যা হয়ে থাকে বেশিরভাগ সময় অতি আদরে ছেলেমেয়েরা বিগড়ে যায়, এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি৷ পার্থক্য শুধু কৌশিক পড়াশোনায় ভাল ছিল৷ এর পেছনে অবশ্য কৌশিকের মায়ের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি।
কিন্তু রুম্পার চাকরি করাটা কৌশিক এবং তার পরিবার মেনে নিতে পারেনি। ওদের তো অভাব নেই। রুম্পার বেতন দিয়ে তো সংসারের জ্বালানির খরচও উঠবে না৷ অনর্থক ছোট বাচ্চা রেখে বাইরে যাওয়া কেন? যখন বাচ্চা ছিল না তখন করেছ। যদিও প্রয়োজন ছিল না৷ এখন দুধের শিশুকে কষ্ট দিয়ে কেন চাকরি করা? এই নিয়ে কৌশিক রোজ রোজ অশান্তি করে৷ অনেকসময় ওর শাশুড়িও এতে ঘি ঢালেন৷ শ্বশুরের ভূমিকা ঠিক বোঝা যায় না৷ তবে মানুষটি ছেলের মত নোংরা মনের নয়৷ বরং বৌ এর বুদ্ধির ওপর তাঁর অনেকখানি আস্থা রয়েছে৷

আজ রুম্পার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে৷ কাল রাতে কৌশিক জানোয়ারের মত আচরণ করেছে৷ যেদিনই রুম্পার চাকরি নিয়ে মাথা গরম করে সেদিনই সব নোংরামি শেষ হয় নিজের ভিতরের পশুত্বের প্রকাশ দিয়ে। রুম্পা অনেকসময় ভাবে অনেক হয়েছে৷ আর নয়৷ এবারে কৌশিকের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে মেয়েকে নিয়ে চলে যাবে৷ এর চেয়ে একা থাকা অনেক ভাল। প্রতিদিন একটু একটু করে মরার চেয়ে হয় একেবারে নিজেকে শেষ করে দেয়া ভাল। তখনই তিন্নির চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে ভয় পেয়ে যায়৷ বাকি থাকল কৌশিকের থেকে ডিভোর্স নিয়ে মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকা। যদিও সেই থাকাটাও খুব একটা প্রীতিকর হবে না সমাজের চোখে, সম্মানের চোখে অনেকেই দেখবে না৷ কিন্তু আর কত? তাহলে কী রুম্পা একটু স্বস্তির আশায় চাকরি ছেড়ে দেবে? যখনই এমন ভাবনা মাথায় আসে, রুম্পা যেন কেমন হয়ে পড়ে! তার ছোটবেলা থেকে লালিত স্বপ্ন স্বাবলম্বী হওয়ার, সেই স্বপ্নকে একটা জানোয়ারের জন্য বিসর্জন দেবে? এইজন্যই কী বাবা এত কষ্ট করে ওদের পড়িয়েছিলেন? একেক সময় ভাবে দিদিদের জানায় সবকথা৷ আবার ভাবে ওদের সুখের সংসারে কেন ছন্দপতন ঘটানো? আর কৌশিক যেরকম রগচটা, জামাইবাবু কী দিদিদের অপমান করতে দুবার ভাববে না৷ নাঃ! রুম্পার নিজের সমস্যা নিজেকেই সমাধান করতে হবে৷ যখন প্রায় প্রতিদিন রুম্পা নিজের সঙ্গে যুঝে চলেছে, তখনই একদিন দূর থেকে শপিং মলে দেখতে পেল সুনির্মলকে। সুনির্মল দেখতে পায়নি ভেবে রুম্পা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল৷ কিন্তু সুনির্মল ঠিকই দেখতে পেয়ে রুম্পাকে ডেকে উঠল৷ রুম্পার পা যেন আটকে গেল শপিং মলের মেঝের টাইলসের সাথে৷

সুনির্মল এগিয়ে এসে রুম্পার সামনে এসে দাঁড়াল৷ আগের মত অধিকারবোধের গলায় বলে উঠল না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলে যে বড়!
রুম্পা আমতা আমতা করছিল৷ ওমা! না দেখার ভান করব কেন? আসলে বাড়িতে ছোট্ট মেয়েকে রেখে এসেছি কি না। তাই ফেরার তাড়া ছিল।
রুম্পা তুমি তো জান আমি তোমাকে যতটা চিনি ততটা মনে হয় আর কেউ চেনে না৷ আর তুমি তো মিথ্যে বলতে পার না৷ কাজেই ওই চেষ্টা কেন করছ?
রুম্পার কপালে চিকন ঘাম দেখা দিল। বুকের ভিতর ধড়াস ধড়াস করছে৷ যদি কোন কারণে কৌশিক এই মলে এখন চলে আসে? তাহলে…
কী ভাবছ? সুনির্মল আবার প্রশ্ন করল?
ছেলেরা এত অবুঝ কেন? রুম্পা ভাবল। ওর যে সত্যিই মেয়ের জন্য এখনই ঘরে ফেরা দরকার৷ শুকনো গলায় বলল কই কিছু ভাবছি না তো। না মানে মেয়েটার কথা মনে হচ্ছে।
তোমার শাশুড়ি আছেন তো৷ তিনি সামলে নেবেন৷ চলো কফি খেয়ে নেই। কতদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা হলো বলতো? বিয়েতে তো বললেই না৷ ভেবেছিলে আমি বিয়ে ভেঙ্গে দেব? বলেই সুনির্মল হে হে করে হাসতে লাগল৷
রুম্পার গা গুলিয়ে উঠল। একদিন এই লোকটাকে রুম্পার ভাল লাগত? তাও তেমন কোন ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠার আগেই ওর বিয়ের প্রস্তাব চলে এসেছিল৷ বাবাও দেরি করেননি৷ এখন সুনির্মলের এমন অবিবেচকের মত আচরণে রুম্পা অবাক হয়ে ভাবল এই লোকটির মধ্যে ও তখন কী দেখেছিল? কৌশিকদের বাড়ি থেকে যখন বিয়ের প্রস্তাব আসে রুম্পা একবার ভেবেছিল সুনির্মলের সাথে দেখা করবে৷ তবে পরে বাবার সম্মানের কথা ভেবে বাবার কথাই মেনে নিয়েছিল৷ এতদিন রুম্পার ভিতর একধরণের অপূর্ণতা কাজ করত৷ অনেকসময় মনে করত সুনির্মলের সঙ্গে ওর সেদিন কথা বলা উচিৎ ছিল৷ তাহলে আজ হয়তো বা ওর জীবন অন্য রকম হতো৷ কিন্তু আজ হঠাৎ এই মলে সুনির্মলের সাথে দেখা হয়ে তার কথা শুনে রুম্পার মনে হলো সব ছেলেরাই কী একতরফা তার ভাবনা নিয়েই চলে? তারা কী বিপরীত দিকের মানুষকে শ্রদ্ধা করতে পারে না? সেই ছোট বেলা থেকে দেখে আসছে ছেলেদের। আজ একবিংশ শতাব্দীর ১৯টি বছর চলে যাচ্ছে। এখনও ওরা একই রকম ভাবে? এভাবে আর কতদিন চলবে?

এমন সময় সুনির্মল আবার তাড়া দিল কফি খেতে যেতে। এবারে রুম্পা দৃঢ়তার সাথে বলল, না সুনির্মল এটি সম্ভব নয়৷ আমার শিশু কন্যার চেয়ে একদার ক্লাসমেটের সঙ্গে কফি খাওয়া আমার কাছে খুব সুখকর কিছু হবে বলে মনে হয় না৷ তুমি আমাকে ভুল বোঝো না৷ আমাকে এখন বাড়িতে যেতেই হবে৷ আর একটা কথা বললে না তুমি আমাকে যতটা চেন…. আসলে আমরা কী সত্যি নিজেকে চিনি? চেনার চেষ্টা করি? যদি তাই হতো তাহলে ঘরে একটি শিশু তার মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে জেনেও তুমি তার মাকে কফি খেতে জোর করতে পারছ? এটাকেই কী Male Chauvinism বলে? ‘ প্রশ্নটা সুনির্মলের মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে মাথা উঁচু করে রুম্পা গটগট করে শপিং মল থেকে বের হয়ে এল। রুম্পা নতুন করে যেন সাহস সঞ্চয় করল৷ এরপরে যেদিন কৌশিক ওকে অপমান করবে সেদিন সেও ছেড়ে কথা কইবে না। লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরেও যদি স্বামী নামক প্রভুরূপী জানোয়ারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয় তাহলে এই পড়ার কী মূল্য রইল?

অঞ্জনা দত্ত এর ফেইসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে অদৃশ্য বরফ গলাতে উষ্ণতা ছড়াবেন শ্রিংলা

সংবাদ পরিক্রমা: ভারতের পরবর্তী পররাষ্ট্র সচিব হচ্ছেন হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা; যিনি এর আগে বাংলাদেশে ভারতের ...