Home / লেখক / দেবীবন্দনা এবং অন্তরে বাহিরে আসুরিক শক্তি : শ্যামল চন্দ্র কর্মকার

দেবীবন্দনা এবং অন্তরে বাহিরে আসুরিক শক্তি : শ্যামল চন্দ্র কর্মকার

শ্যামল

‘জাগো, জাগো দুর্গা জাগো দশপ্রহরণধারিনী
অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো’

সনাতনধর্মালম্বী বাঙালিদের শারদোৎসবের সূচনালগ্নে মহালয়ার ভোরে দেবী আবাহনের এ সংগীতের সুরে এক অন্যরকম শিহরণ। প্রাণে প্রাণে ধ্বনিত হয় মায়ের আগমনী বার্তা। মহালয়ার পর শুরু হয় দেবীপক্ষের। অতপরঃ মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী পূজা শেষে বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুর্গা পূজার মহা আয়োজন। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, দেবী দুর্গা যেমন অসুরদের বিনাশ করে স্বর্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি তিনি অকালবোধনে মর্ত্যে এসে সকল আসুরিক শক্তির বিনাশ করে শুভ শন্তির বিজয় সূচিত করবেন। দূর হবে সকল দুর্গতি। দেবী দুর্গা মাতৃরূপে, পিতৃরূপে, শক্তিরূপে, শান্তিরূপে, বিদ্যারূপে আবির্ভূত এক মহাশক্তি। তিনি সম্মিলিত দেবশক্তির প্রতীক। অসুর অর্থাৎ অপশক্তি বিনাশে দেবতারা তাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্টি করেন মহাশক্তি মহামায়া। পুরাণের মত অনুসারে, শিবের তেজে দেবীর মুখ, যমের তেজে কেশ, বিষ্ণুর তেজে বাহুসমূহ, চন্দ্রের তেজে স্তনদ্বয়, ইন্দ্রের তেজে মধ্যভাগ, বরুণের তেজে জংঘা ও উরু, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল। মহাদেব দিলেন শূল, কৃষ্ণ দিলেন চক্র, শঙ্খ দিলেন বরুণ, অগ্নি দিলেন শক্তি। এই হল বিপদনাশিনী দেবীমাতা দুর্গা। দুর্গতি হতে ত্রাণ করেন বলেই দেবীর নাম হয়েছে দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত অনুষ্ঠিত হয় মার্ক-েয় পুরাণের ভিত্তিতে; দেবী পুরাণ, কালিকা পুরাণ, বৃহৎ নন্দিকেশ্বর পুরাণ, দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী, দেবী ভাগবত ইত্যাদি গ্রন্থের ভিত্তিতে। এ গ্রন্থগুলো অনেক পুরনো। তার থেকে নির্বাচিত সাতশটি শ্লোক নিয়ে যে সংক্ষিপ্ত মার্ক-েয় পুরাণ করা হয়েছিল তাকেই বলা হয় দুর্গাশপ্তশতী বা শ্রীশ্রীচ-ী। চ-ীর বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় মায়ের নাম হয়েছে দুর্গা। দুর্গম অসুরের কাজ ছিল জীবকে দুর্গতিতে ফেলা। দুর্গমকে বধ করে যিনি স্বর্গ বিতাড়িত দেবগণকে হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দেন এবং জীবজগৎকে দুর্গতির হাত থেকে রক্ষা করেন তিনি মা দুর্গা। এছাড়া মহিষমর্দিনী, শূলিনী, পার্বতী, কালিকা, ভারতী, অম্বিকা, গিরিজা, বৈষ্ণবী, বাহারী, চ-ী, লক্ষী, উমা, হৈমবতী, কমলা, শিবাণী, যোগনিদ্রা ইত্যাদি নামে ও রূপে মায়ের পূজা হয়ে থাকে।

পরাশক্তির অধিকারী অসুরকে বধ করার জন্য মা দুর্গা দশ হাতে দশ অস্ত্রে সুসজ্জিত দশদিক রক্ষার প্রতীক। তার পায়ের নিচে আছে উদ্ধত সিংহ আর উদ্ধত অসুর। সিংহ রাজসিক আর অসুর তামসিক শক্তির প্রতীক। পশুরাজ সিংহ সাত্ত্বিক গুণাশ্রয়ী দেবীকে বহন করে। দেবী কাঠামোতে শোভা পায় দেব সেনাপতি কার্তিক, যিনি শক্তির প্রতীক। সিদ্ধিদাতা গণপতি গণেশ, বিদ্যাদায়িনী সর্বশুক্লা সরস্বতী ও প্রভূত ঐশ্বর্যময়ী দেবী লক্ষী। কিন্তু সবার উপরে শোভা পান মঙ্গলের বার্তাবাহী দেবাদিদেব মহাদেব। সবাই দেবীর এক এক শক্তির প্রতীক। মূলে কিন্তু তিনি এক পরমাবিদ্যাস্বরূপিনী, যিনি সর্বভূতের প্রাণরূপী মহাদিব্যমূর্তি মা ও জগৎ মঙ্গলময়ী দুর্গা। দেবসেনাপতির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন নবপত্রিকা বা কলাবউ। সর্বজীবের প্রাণরক্ষার উপযোগী শাকগুলোর দ্বারা পৃথিবীকে পালনকারিনী দেবীর নাম সার্থক করার মানসেই দুর্গাপূজার নবপত্রিকা রচনার বিধান রয়েছে। কেননা দেবীর আর এক নাম শাকম্বরী।

অসুরঃ অন্তরে ও বাহিরে
কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর
মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক মানুষের মাঝে সুরাসুর।’

দেবতাদের ও অসুরের মধ্যে যেমন সংঘাত, পৃথিবীতেও শুভ ও অশুভ শক্তির মধ্যে রয়েছে চিরন্তন দ্বন্দ্ব। মানবের অন্তরেও দৈবশক্তির সঙ্গে আসুরিক শক্তির লড়াই সর্বদাই লেগে আছে। মানব মন তিনটি গুণে গুণান্বিত। তমোগুণ, রজোগুণ এবং সত্ত্বগুণ। দেখা যায় তমোগুণের অধিকারী মানবের মধ্যে পাশবিকতা অর্থাৎ পশুর ভাবগুলো বেশি বিদ্যামান-আহার, নিদ্রা, মৈথুন এদের সর্বস্ব। আবার রজোগুণ প্রধান মানুষে দেখা যায় তারা কর্মের প্রতি আসক্ত। কিন্তু সে কর্ম নিষ্কাম নয়, সকাম কর্ম। যা মানবকে মুক্তির পরিবর্তে বন্ধনের কারণ হয়। আমরা এটি অসুরের মধ্যে দেখতে পাই। অপরদিকে সত্ত্বগুণ আধিক্য মানুষেরা সৎ স্বভাবের হন।তারা শান্ত, স্থির বুদ্ধি ও অবিচল হন। এরা নিজের দায়িত্ব পালন করেন কিন্তু ফল আশা করেন না। এইরূপ মানুষরা কারো ক্ষতি করেন না, লোভ লালসাও তারা করেন না। যাদের পবিত্র মনের আলোতে অন্যরা আলোকিত হন। মানব মনে আসুরিক ভাবগুলো এবং পাশুবিক ভাবগুলো প্রবল থাকায় দৈবীভাবগুলো যা সত্ত্বগুণজাত তা প্রকাশিত হতে পারে না।

অসুরবিনাশিনী মা দুর্গা তিনবার আবির্ভুত হয়েছিলেন তিন অসুর প্রবৃত্তি বোধের বিনাশের জন্যে। প্রথমবার মধু কৈটভ বধের জন্য,দ্বিতীয়বার মহিষাসুর বধের জন্যে আর তৃতীয়বার শুম্ভ নিশুম্ভ বধের জন্যে। এই তিন অসুর বধের মধ্যেই রয়েছে প্রতীকি ব্যঞ্জনা। কিন্তু সাধনার মাধ্যমে আসুরিক, পাশুবিক ভাবগুলো দূরীভূত করতে পারলে দৈবভাবগুলোর স্ফূরণ ঘটে। তখনই মানুষ প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী হয়। সে ভগবানের কৃপা লাভের যোগ্য হয়ে মানব জীবন সার্থক করতে পারে। মধু কৈটভ হল মায়া ও মোহের প্রতীক। কর্তৃত্বের বন্ধনের প্রতীক হল মহিষাসুর। আর শুম্ভ নিশুম্ভ হল অহংকার ও অভিমানের প্রতীক।

এ যুগের যত অসুর :
এ যুগে দেশে দেশে ও নানা সমাজে রয়েছে অজস অসুরের ছড়াছড়ি। খুনী,সন্ত্রাসী,নারী ও শিশু লাঞ্ছনাকারী, মানুষকে শোষণকারী, অত্যাচারী, অন্যকে অপহরণকারী, দেশদ্রোহী, লোভী ও দুর্নীতিপরায়ন, ব্যাংকের টাকা লোপাটকারী, জঙ্গী ও মাদকদ্রব্যের কারবারী প্রত্যেকেই এ যুগের অসুর। এদের মধ্যে কেউ বড় অসুর, কেউবা ছোট অসুর। এদের প্রভাব বেড়ে গেলে মানুষের বুকে হাহাকার বেজে ওঠে। এরা সবাই সমাজের অশুভ শক্তি। এ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধেই শুভ শক্তির নিয়ত সংগ্রাম। যে সমাজে শুভ শক্তির জয়জয়কার সে সমাজ হয় সুখী ও সমৃদ্ধ। দেবী দুর্গা যেহেতু অসুরবিনাশিনী, তাই তাঁর বন্দনা ও আবাহন করে অসুররূপী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।

সঠিক নিয়ম মেনে দুর্গা পূজাঃ
দুর্গা পূজা শুধু মাত্র বিনোদন কিংবা উৎসব নয়। শাস্ত্রবিধি অনুসরণ না করে দুর্গা পূজা আয়োজনের নামে যেন শুধুমাত্র বিনোদনকেই প্রাধান্য না দেয়া হয়, সেদিকে আয়োজকদের খেয়াল রাখতে হবে। দেবীর সামনে আরতি মানে ধূপ দীপ জ্বালিয়ে আর্তি সহকারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা। এ ক্ষেত্রে উদ্ভট মিউজিকের সাথে উশৃঙ্খল নৃত্য কিছুতেই কাম্য নয়। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত সন্ধিপূজাসহ সকল পূজা অর্চনে যথাযথ নিয়ম ও ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখা উচিত। এ জন্য পূজারী এবং আয়োজকদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা কর্তব্য। দুর্গা মায়ের মহিমা সম্যকরূপে অনুধাবন করলে, তাঁর চরণ বন্দনা করলে দেবী মায়ের কৃপায় ভগবদ্ভক্তির উন্মেষের মাধ্যমে ক্ষয়িষ্ণু সনাতন সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখক: যুগ্মসচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

Lion Gani Miah babul

আমার বাবা আমার প্রেরণা ও শক্তির উৎস

আমার বাবা মোঃ ইসমাইল হোসেন। তিনি শুধু আমার জন্মদাতা নন, আমার আদর্শেরও প্রতীক। তিনি আমার ...