Home / ফেইসবুক কর্নার / তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে (চার) ………. নীরেশ চন্দ্র দাস

তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে (চার) ………. নীরেশ চন্দ্র দাস

niresh das

প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার একটিপ্রখ্যাত জনপ্রিয় গান —
“ঠিকানা না রেখে ভালই করেছ বন্ধু,
না আসার কোন কারন
সাজাতে হবেনা তোমায় আর,
বানানো কাহিনী শোনাতে হবেনা,
কথা দিয়ে না রাখার “।

গানটি অত্যন্ত আবেগের, অত্যন্ত অভিমানের। বলা যায় বেদনার বা হতাশার ও। আমার খুউব প্রিয় গান এটি।

গানটির মর্মকথা হলো প্রেমাস্পদ চায় তার প্রেমিক তার কাছে নিয়মিত আসবে। চিঠির মাধ্যমে বানোয়াট কারন দেখিয়ে তার কাছে আসা বন্ধ করবেনা। কারন,এই না আসার বেদনা তাকে ব্যথিত করে,পীড়িত করে। সে তাহা সহ্য করতে পারে না। ঠিকানা না থাকলে নিয়মিত যোগাযোগ থাকবেনা, প্রিয়তম কখন আসবে তা জানা যাবেনা একথা মর্মবেদনার এবং কষ্টের, কিন্তু বানোয়াট কোন কারন দেখিয়ে প্রতিক্ষিত দিনে না আসা প্রেমাস্পদের জন্য আরও বেশী বেদনার, বেশী কষ্টের। তাই এই অভিমান। তাই এই বিরাগ।

আমাদের লৌকিক সংস্কৃতির প্রায় পুরো যায়গাই দখল করে আছে অভিমান, আবেগ, বিরহ বেদনা ইত্যাদি । টেলিফোন আবিষ্কারের পূর্বে দূরের প্রিয়জন দের নিকট তা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। বৃটিশদের হাত ধরে এদেশে ডাক বিভাগ চালু হয়েছিল ১৭৬৪ সালে এবং টেলিগ্রাম ১৮৫০ সালে।

বৃটিশরা আমাদের দেশ ২০০ বছর শাসন করেছিল একথা সত্য আবার যোগাযোগ এর সুবিধার জন্য বাস্পীয় ইঞ্জিন, ডাক বিভাগ এবং রেল লাইন বৃটিশরা না করে গেলে কখন তা আমাদের দেশে চালু হতো তা নিয়ে ও প্রশ্ন আছে।

এক সময় ডাক বিভাগই ছিল জন সাধারনের খবর পাঠানোর বিশ্বস্ত মাধ্যম। তারও আগে ব্যক্তিগত খবরাখবর কি ভাবে পাঠানো হতো তা জানা নাই। তবে ইতিহাসে আছে রাজা রাজরা গন ঘোড়ায় করে দূত মারফতে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে খবরাখবর/ফরমান ইত্যাদি পাঠাতেন। এও শোনা যায় রাজরানী /রাজ কন্যা গন কবুতরের মাধ্যমে দূর দূরান্তরে প্রিয়জনের নিকট খবর আদান প্রদান করতেন। এটা গল্প না কিং বদন্তি জানিনা।
তবে বাংলা দেশের মেহের পুর জেলার আমঝুপির নীল কুঠিতে বৃটিশ আমলে তৈরি আজও কয়েকটি কবুতরের ঘর আছে । কথিত আছে নীল কর সাহেব গন যে কবুতরের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করতেন, এটা তাদেরই বাসস্থান । এই নীল কুঠিতে নীল গাছের একটি চারা আজ অব্দি নীল কর সাহেব দের অত্যাচারের সাক্ষী হিসাবে দাড়িয়ে আছে।

বৃটিশদের হাত ধরে এদেশে আসা সেই ডাকঘর, ডাক বাস্ক ছিল রাষ্ট্র সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে যোগাযোগ এর মাত্র মাধ্যম। সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার সিনেমা যারা দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে অপু (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) টেলিগ্রাফের মাধ্যমে যখন খবর পেলেন তার স্ত্রী পুত্র সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেছেন সে সংবাদ সহ্য করতে না পেরে ডাক পিয়নকে চর মেরে দিলেন। এরকম ই আবেগ। এক সময়ে জরুরী খবর পাঠানোর একমাত্র মাধ্যম ছিল টেলিগ্রাম। সেই দিন ও আজ আর নাই। ইমেইল টেলিফোন সব ছিনিয়ে নিয়েছে।
কালের গতির সাথে তাল মিলাতে না পেরে পোষ্টাল ডিপার্টমেন্ট আজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে । কিন্ত এখনো হারিয়ে যায়নি নীচের এই ডাক বাস্কটি তার প্রমাণ । শুধু আমরা ই যেন তাকে কাজে লাগাতে পারছি না। সর্বশেষ কবে কোনদিন কে এসে এখানে চিঠি রেখে ছিল, পোস্ট অফিস থেকে কখন লোক এসে এই বাস্ক থেকে চিঠি খোলে নিয়ে গেছে তা গবেষণার বিষয়। তবে চেহারা দেখে মনে হয় এটির খোঁজ এখন আর কেউ তেমন ভাবে করেননা।

dak

অথচ এই চিঠি প্রাপকের নিকট সময় মতো পৌঁছে দেয়ার জন্যে এক সময় ডাক বিভাগের কর্মীরা বিনিদ্র রাত কাটাতেন ।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতায় রানারদের আত্মনিবেদন এর যে করুন কাহিনী বিধৃত হয়েছে তাহাতো বাংলা সাহিত্যের অমর এক জীবন সংগীত।

যাহারা সুকান্ত ভট্টাচার্যে রচিত ” রানার” কবিতার সুরাপিত গানটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শোনেছেন তারা কি কখনো ভুলে যাবেন রানার দের আত্মত্যাগের মহিমা?
“রানার ছুঠেছে তাই ঝুম ঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে,
রানার ছুটেছে খবরের বোঝা হাতে “।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোস্ট মাষ্টার ছোট গল্পের সেই রতন ও পোষ্ট মাষ্টার কে কি বাংলা সাহিত্য কোনদিন ভুলতে পারবে? তাও তো এই ডাক ঘরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এক মর্ম বেদনার কাহিনী।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেও জরুরী প্রয়োজনে কেউ রেল ভ্রমণ করলে সঠিক সময়ে গন্থব্যে পৌঁছার জন্য মেইল ট্রেনেই চড়তেন।
ডাক বিভাগ কেমন গুরুত্তের সহিত কাজ কর্ম করতো তার একটি উদাহরণ আমার স্মৃতিতে সসমুজ্জ্বল । আমি ক্লাস টেন পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলায় একটি হাই স্কুলে পড়েছি। সেই স্কুলের সামনের সদর রাস্তা দিয়ে একজন ডাক হরকরা মেইল নিয়ে সপ্তাহে ছয়দিন যাতায়াত করতেন। প্রতিদিন আমাদের স্কুল ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে পাচ মিনিটের মধ্যেই তার সাথে একই যায়গায় দেখা হতো। পাঁচ বছরের মধ্যে তার কোন ব্যত্তয় হতে দেখিনি । নিয়মানুবর্তিতার উজ্জ্বল এক উদাহরণ তার মধ্যে দেখেছিলাম।

সিলেটের জিন্দাবাজারের এই ডাক বাস্কটা দেখার অল্প কদিন পরেই আমি সঞ্চয় পত্র কেনার জন্য সিলেট প্রধান ডাক ঘরে গিয়ে ছিলাম। ভিতরে ঢুকেই মন টা খারাপ হয়ে গেল। ঘরে আর আগের মতো আলো নাই, লোক ও নাই । অনেক লম্বা ফ্রন্ট ডেস্কের একটি ছাড়া কোন কাউন্টারেই কোন লোক নাই। যে পোস্ট অফিসে লাইনের পিছনে না দাড়ালে মনিওর্ডার ফর্ম, ডাকটিকিট ইত্যাদি কেনা যেতো না , আজ সেখানে কোন গ্রাহক নাই। আলাদা করে রাখা দেশী বিদেশী চিঠির বাস্কগুলি শূন্য প্রায়। চাকুরীর দরখাস্ত ও টেন্ডার জমা দেবার সময় ব্যাংক ড্রাপ্ট ও পোষ্টাল অর্ডার কেনার যে বাধ্য বাধকতা ছিল, অনলাইন ব্যাংকিং এর কারনে তাও আজ অপরিহার্য্য নয়। গ্রাহকদের সুবিধার জন্য পোস্ট অফিসের ভিতরে রাখা গামের কৌটাটি ও শুকনো হয়ে পরে আছে। মনে হয় অনেকদিন এটা নিয়ে কেউ নাড়াচাড়া করেনি।
এতো বড় প্রতিষ্ঠান এই পর্যায়ে আসার কারন কি অনলাইন ব্যাংকিং, বিকাশ, কুরিয়ার সার্ভিস, ইমেইল ইত্যাদির দাপট, নাকি নিজেদের যুগোপযোগী করে তোলার ব্যর্থতা?

আমি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর নেয়া আমার কাজ নয়। তাই আপাতত লেখাটা শেষ করে নেই বন্ধুদের ধৈর্য চ্যুতির আগেই———-
চিঠি পত্রের মাধ্যমে কখন থেকে আমি যোগাযোগ শুরু করি সেই দিন ক্ষণ আজ আর মনে নাই। তবে ক্লাস এইট অথবা নাইনে পড়ার সময় আমার প্রাইমারী স্কুলের এক সহপাঠীর কাছ থেকে যে চিঠি পেয়েছিলাম সে কথা মনে আছে। এই বন্ধুটি ছিল আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল। দারিদ্রতার কারনে ম্যাট্রিক পরিক্ষার অনেক আগেই জীবিকার সন্ধানে সিলেটে যেতে হয়ে ছিল তাকে।

তার পর থেকে যত দিন গেছে আমার চিঠি পত্র লেখার পরিমাণ ততই বেড়েছে। পেয়েছি ও অনেক। বন্ধুদের চিঠি, আত্মীয় স্বজনের চিঠি, বিয়ের চিঠি, ভাল বাসার চিঠি। চিঠি পেলে আনন্দ হতো, রোমান্স হতো। দুঃখের চিঠি ও অনেক পেয়েছি। কেঁদেছি ও।
মনে পড়ে ১৯৭১ সালে মেঘালয়ের শরনার্থী শিবিরে আমি যখন সপরিবারে আশ্রিত তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধু প্রশান্ত আমার খোঁজ নিতে ক্যাম্পের ঠিখানা আন্দাজ করে আসামের কোন শরণার্থী শিবির থেকে আমায় একটি চিঠি লিখে ছিল। সেই প্রশান্ত বছর খানেক আগে মার্কিন মুল্লুকে মারা গিয়েছে। দেশ স্বাধীন হবার পর ময়মনসিংহের একটি মফস্বল কলেজে আমি চাকুরী নিয়ে ছিলাম। সেখানে নিয়মিত পত্রিকা পাওয়া যেতোনা। তাই নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য নিয়মিত চিঠি পত্র লিখতাম। প্রতি দিন বিকাল বেলায় চিঠির অপেক্ষায় থাকতাম। একদিন পোস্ট কার্ডে চার লাইনে লেখা আমার বন্ধুর চিঠি পেলাম। চার লাইনের চিঠি —
” নীরেশ! অভিমন্যুর ন্যায় একদিন ব্যুহ চক্রে প্রবেশ করেছিলাম। প্রবেশ পথ জানাছিল, বহির দ্বার জানা ছিলনা। বিবাহ বন্দন ই বহির্গমনের একমাত্র পথ। আগামী রবিবার উল্কা ট্রেনের — নং কামরায় আখাউড়া স্টেশনে অবশ্যই থাকবি। বন্ধুর চিঠি পাওয়ার তিনদিন আগেই বিয়ের তারিখ চলে গেছে। তাই আর যাওয়া হয়নি। ওরা আজও ভাল আছে সুখে আছে। জীবনে কত চিঠি লিখেছি, কত চিঠি পেয়েছি তার কোন হিসাব নাই। কলেজে শিক্ষকতা করার সময়ে একটি মেয়ের সাথে ও আমার পত্র যোগাযোগ হয়েছিল। ঘনিষ্টতা ও ছিলো । আমাদের সময় পরিবার, সমাজ এইসব নিয়ে অনেক ভাবতে হতো তাই ওর সাথে আমার বিয়ে হয়নি। বিয়ের পর ঘটনাটি আমার সহধর্মিণীর নিকট বলেছিলাম। কারন আমার বিশ্বাস ছিলো সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য একে অপর কে সন্দেহাতীত ভাবে জানা জরুরি।

লেখা টা লম্বা হয়ে যাচ্ছে, শেষ করতে হবে। কিন্তু আমার সমস্যা হলো শেষ করতে গিয়ে আমি খেই হারিয়ে ফেলি। তবুও শেষ তো করতে ই হবে। আমার গ্রাম থেকে তিন কিঃ মিঃ দূরে মার্কুলি বাজারে আমাদের পোস্ট অফিস। প্রযত্নে বা C/O লেখা না থাকলে কোন চিঠিই সময় মতো আমাদের বাড়ীতে পৌঁছাত না। তাই মার্কুলি বাজারের প্রয়াত ডাক্তার অরুণ কুমার চক্রবর্তীর প্রযত্নেই আমার সব ইন্টারভিউ কার্ড ও এপয়েন্টমেন্ট কার্ড আসতো। এই মানুষ টির প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি যখন বি কম পরীক্ষা দেই তখন ফল জানার জন্য আমাকে সিলেট বা হবিগঞ্জ যেতে হতো। কারন পত্রিকা ছাড়া রেজাল্ট জানার কোন উপায় ছিলনা। ফল প্রকাশের সময় আসন্ন। কি করবো ভাবছি। হঠাৎ করে সিলেট থেকে আমার এক স্যারের চিঠি।

নীরেশ ! তোমার বি কমের ফল প্রকাশিত হয়েছে । বৃন্দাবন কলেজে কেউ প্রথম শ্রেণীতে পাশ করে নাই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র তিনটি প্রথম শ্রেণী । ২য় শ্রেণী ১৩৭ টি। তোমাদের কলেজে ৫ জন ২য় শ্রেণীতে পাশ করেছে। তার মধ্যে তুমিও একজন। সাথে পত্রিকাটি (দৈনিক সংবাদ) দিয়া দিলাম। তুমি আমার আশীর্বাদ নিও। স্যারের এই চিঠির কথা আমার স্মৃতিতে আজ ও সমুজ্জ্বল। কুরিয়ার সার্ভিসের প্রবর্তনের পরে আমি কবে ডাক বিভাগের চিঠি পেয়েছি আমার মনে নাই ঘরে অনেক খোঁজে ১৯৯৩ একটি চিঠি পেয়েছি । সেই চিঠি খানি বন্ধুদের শেয়ার করলাম।
পরিশেষে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর গাওয়া রানার কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়েশেষ করছি।
এমনি করেই জীবনের বহু বছরকে
পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে
দিয়েছে ‘ মেলে ‘।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে
অল্প দামে।
অনেক দুঃখ, বহু বেদনায় অভিমানে
অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র
রাত জাগে।
সবাই কে অগ্রিম শারদীয় শুভেচ্ছা।

নীরেশ চন্দ্র দাস এর ফেইসবুক থেকে নেওয়া।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ওসমানি

আজ সেই সূর্য সন্তানের জন্মদিন

আজ সেই সূর্য সন্তানের জন্মদিন, যার নিজের যোগ্যতার রেঙ্ক দিতে বাধ্য হয়ে পাকিস্তানী জেনারেল তাচ্ছিল্য ...