Home / ফেইসবুক কর্নার / তোমার খোলা হাওয়া ——-লাগিয়ে পালে (দুই)

তোমার খোলা হাওয়া ——-লাগিয়ে পালে (দুই)

niresh das

২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি ব্যাংকের চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করি। নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কোন অঘটন ছাড়া এক টানা ৩৪ বৎসর ব্যাংকের চাকুরি শেষ করতে পারাটা আমার কাছে অনেকটা স্বস্তিদায়ক ছিলো। কিছুটা গৌরবের ও বলতে পারি এজন্য যে চাকরির মেয়াদ শেষ হবার পরও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পক্ষ আমাকে মহাব্যবস্থাপক এর পদ মার্যাদায় চুক্তি ভিত্তিতে আর ও তিন বৎসর চাকুরী করার সুযোগ দিয়েছিলেন। তবে অবসরে যাওয়ার পূর্বে মনে

কিছুটা সংশয় ছিল, অত্যন্ত কর্মব্যস্ত জীবনের সোনালী দিন গুলি চলে যাবার পর হঠাৎ স্থবির হয়ে পড়া এই গতিময় জীবন কি করে চলমান থাকবে?

চট্টগ্রামের বড়ুয়া বাবুর কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে। তিনি বাংলা দেশ ব্যাংকের অবসর প্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা ছিলেন। আগ্রাবাদ বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনিতে তার জামাতা কল্যাণ বড়ুয়ার বাসায় আমি সাব লেট ছিলাম। আমার সাথে যখন তার পরিচয় হয় তখন তার বয়স ৭৫ র কাছাকাছি। বছরের অধিকাংশ সময় তিনি ওখানেই থাকতেন। সারাদিন পান আর চা খাওয়া ও পত্রিকা পড়া ছাড়া তার কোন কাজ ছিলনা। সময় পেলেই আমার ঘরে আসতেন, গল্প করতেন। তার সোনালী দিনের গল্প। বিপত্নীক এই মানুষটির জন্য আমার অনেক শ্রদ্ধাবোধ ছিলো ।
১৯৯৮ ইং তে আমি যখন উত্তরা ব্যাংক সিলেটে জোন এর জোনাল হেড হিসাবে বদলি হই তখন তিনি যেন কোন কিছু হারানোর আশংকায় এক ধরনের অসহায়ত্ব অনুভব করেছিলেন। উপযাচিত হয়ে আমায় বলেছিলেন, নীরেশ বাবু আপনাকে একটা কথা বলি? আমি বললাম নিশ্চয়। তিনি আবার বললেন ছোট বেলায় The Cow রচনা পড়েছেন মনে আছে? আমি বললাম হ্যাঁ । তিনি বললেন ঐ লাইন টা মনে আছেতো ? The Cow lives on grass ? হ্যাঁ সূচক জবাব দিতেই তিনি বললেন আমার সাথে আপনার

হয়তো আর কখনো দেখা হবেনা। তবে আমার একটি উপদেশ মনে রাখবেন ” An old man lives on legs “.এই প্রসংগে আমার ঠাকুমার কথাও মনে পড়ে যায়,
শেষ বয়সে তিনি যখন স্বচ্ছন্দে হাটতে পারতেন না তখন প্রায়ই বলতেন,
” চরনে বুঝায় মরনের খবর”।
বড়ুয়া বাবু বলছিলেন আপনার বয়স তো বাড়ছে, যতদিন পারেন হাটা হাটির অভ্যাসটা চালিয়ে যাবেন। তাইলে ভাল থাকবেন। অবসরোত্তর জীবনের জন্য এই বয়োজ্যোষ্ট মানুষটির উপদেশ আমি হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলাম। যার জন্য আজ অব্দি আমার হাটার অভ্যাস চালু আছে।
আর একটা বিষয়ে মন স্থির করেছিলাম যখনই সুযোগ পাব একটু ভ্রমণ করবো।সেটা যেখানেই হোক। চাকুরির ব্যস্ততার জন্য কর্মজীবনে ঘুরাঘুরির সুযোগ পাইনি।

২০০৮ ইং, ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখ আমি চাকুরী ছেড়ে ঢাকা থেকে স্থায়ী ভাবে সিলেটে চলে আসি আর ১৯ তারিখে ভারত ভ্রমণের একটা সুযোগ পাই। ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান গুলো তে নিয়মিত কন্ডাক্টেড ট্যুর পরিচালনা করে থাকেন এরকম একটি ধর্মীয় সংস্থার সাথে এক মাসের জন্য চুক্তি বদ্ধ হয়ে যাই। এক মাসের প্রোগ্রাম। বাসে করে ঘুরতে হবে ২৮ দিন ধরে ভারতের ১০ টি রাজ্যের বিভিন্ন যায়গায়।
বিশাল এলাকা,পুর্বে আসাম থেকে পশ্চিমে উড়িষ্যার পশ্চিম উপকুল,দক্ষিনে বংগোপসাগর থেকে উত্তরে হিমালয়ের হৃষিকেশ’পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা।

যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ১৯ ফেব্রুয়ারি দুটিবাসে করে রাত বারোটায় সস্ত্রীক সিলেট থেকে চট্টগ্রাম রওয়ানা হলাম। কিছু যাত্রীর ভিসা জটিলতার কারনে চট্টগ্রাম হয়ে বেনাপোল পৌছাতে হলো। এর ই মধ্যেই কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সব কিছু ফেইসবুকে লেখা সম্ভব না। কারন আমাদের ১০২ জন সহযাত্রীর মধ্যে আমরা ৮/১০ জন ছিলাম মূলত ট্যুরিস্ট । অন্যরা তীব্র ধর্মীয় আবেগ ও তাৎক্ষণিক স্বর্গ প্রাপ্তির বাসনায় আচ্ছন্ন তাই সেখানে কোন যুক্তি প্রদর্শন বা বাস্তব জিজ্ঞাসা ছিল নাস্তিকতার নামান্তর। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে আমরা বেনাপোল হয়ে সকাল ১০টা নাগাদ ভারতের হরিদাস পুর সীমান্তে পৌঁছালাম।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি আমাদের সহ যাত্রী গন অতি মাত্রায় ধর্মীয় অনুভুতি সম্পন্ন থাকার কারনে পুরো টা ভ্রমণ ই এক ধরনের আগ্রাসন পরোক্ষভাবে আমাদেরকে সতর্কতার সহিত সামলাতে হয়েছিল। কারন যুক্তি সেখানে আবেগের নিকট পরাভূত। হরিদাস পুরে immigration formalities শেষ করেই তারা (ট্যুর অপারেটর) আমাদের সবাইকে কার্ত্তিক চন্দ্র ঘোষ ও সন্স নামে একটি মানি চেঞ্জারের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে কাউকে তাদের অনুমতি ব্যতীত কোথাও বের হতে মানা করলেন। এবং আরও জানালেন কার ও কাছে ডলার থাকলে ওদের কাছ থেকে ভাংগিয়ে নিতে। অন্যতায় ক্ষয়ক্ষতির দায়িত্ব তারা নিবেননা । ব্যাপার টা আমার মনে সন্দেহের জন্ম দেয়। আমার মেয়ের শ্বশুর আমার সহযাত্রী ছিলেন। আমি উনাকে আমার আশংকার কথা প্রকাশ করলাম। তিনি ধার্মিক লোক । আমার কথা শোনে বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন আপনি নাস্তিক ধরনের লোক। ধর্ম করতে এসে ঐ কাজে যারা সহযোগিতা করছে তাদেরকে সন্দেহ করছেন। আপনি জানেন ? তীর্থযাত্রায় যারা সহযোগীতা করেন তাদেরকে তীর্থ গুরু বলা হয়? তীর্থ গুরুদের সন্দেহ করলে কোন পূণ্য তো আপনার হবেই না বরং মাইনাস পয়েন্ট নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। কিছুটা হতাশ হয়ে সবার মতো করে আমি ও ২০ ডলার ক্যাশ করে চা খাওয়ার কথা বলে বাইরে গেলাম । প্রসংগত বলে রাখা ভাল আমাদের ট্যুর অপারেটর দের বিশ্বাস ও আদর্শ অনুযায়ী চা পান এবং মধ্যপান দুটিই নেশা জাতীয় সমান অপরাধ। একটু দূরে গিয়ে অন্য একটি মানি চেঞ্জারের দোকানে জানতে পারলাম আমাদের দোকানের চেয়ে ঐ দোকানে ডলার প্রতি ত্রিশ পয়সা বেশী পাওয়া যায়। আমি সেখানে ১০০ ডলার ক্যাশ করে নিলাম। কিছু ক্ষনের মধ্যেই দুটি ভারতীয় কোম্পানির বাসে আমাদের উঠায়ে নবদ্বীপ এর উদ্দ্যেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু করলো। দুই রাতের একটানা ভ্রমণ, সবার দেহমনে ক্লান্তির ছাপ, পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা। দুপুরের দিকে এক যায়গায় মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা ছিল। বলতে দ্বিধা নাই ভেজিটেরিয়ান ডিশ হলেও খাবার উপাদেয় ছিলো। সন্ধ্যায় মায়া পুর (ইসকন টেম্পল) এ পৌছালাম। এখানে দুই রাত তিন দিনের যাত্রা বিরতি। ভ্রমণ সূচী অনুযায়ী আমাদের পরবর্তী গন্থব্য বিহারের গয়া, বুদ্ধগয়া, এলাহাবাদ, আগ্রা হয়ে মথুরা ও বৃন্দাবন যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর জন্ম, শৈশব ও যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছেন। আমরা যতই এগোচ্ছি ততই, রাস্তার দূরত্ব কমছে, আমাদের কাফেলা কোন বাধা বিঘ্ন ছাড়াই এগুচ্ছে। একদিন এলাহাবাদ থেকে রাতে রওয়ানা হয়ে সকাল বেলা আগ্রা ক্রস করছি, এমন সময় ট্যুর অপারেটর দের একজন জিজ্ঞেস করলেন আমাদের মধ্যে কেউ তাজমহল দেখতে চাই কিনা? আমরা কজনে বললাম তাজমহল তো ছিল আমাদের ভ্রমণ সূচীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। তাইলে এখানে নামবো কিনা এই প্রশ্ন আসে কেন? তিনি জানালেন আমাদের সাথে আসা তীর্থযাত্রীদের অধিকাংশ ই মনে করেন, তাজমহলে দুটি কবর ছাড়া তেমন কিছু দেখার নাই।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নারী কবিতার দুটি লাইন মনে পড়লো,
” তাজমহলের পাথর দেখেছ,দেখিয়াছ তার প্রাণ?
অন্তরে তার মোমতাজ নারী বাহিরেতে শা-জাহান।”

এখানে সাহিত্য নাই,সসংস্কৃতি নাই,আছে শুধু ধর্মীয় আবেগ অনুভুতি। তবুও আমরা ৮/১০ জন জোর দিয়ে বল্লাম বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটির পাশদিয়ে যাব আর তা দেখবো না তা হবেনা। অগত্যা তারা রাজি হলেন কিন্তু সময় দিলেন এক ঘন্টা। আমাদের দেখা দেখি আর ও তিরিশ জন তাজমহলে প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানে আমরা ২ ঘন্টা ছিলাম। আমাদের ভ্রমণ চলছে। ইতিমধ্যে আমরা দিল্লি,
বৃন্দাবন ইত্যাদি যায়গা ভ্রমণ শেষ করেছি। আমাদের পরবর্তী গন্থব্য কুরুক্ষেত্র। এরই মাঝে গয়াতে ভারত সেবাশ্রম আশ্রমের সামনের গেইট থেকে ৪০০ ডলার এবং ১২০০ ভারতীয় মুদ্রা সহ আমার মানি ব্যাগ খোয়া যায়। আমাদের সহযাত্রী দের কেউ হয়তো খুশী হয়ে থাকবেন নাস্তিকতার ফল হাতে নাতে প্রমান হবার জন্য।

কুরুক্ষেত্র গীতা ও মহাভারতের কাহিনীর জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। শুধু তাই নয় ভারত বর্ষের প্রাচীন কাহিনী নিয়ে রচিত রামায়ণ ও মহাভারত এযাবৎ কাল পর্যন্ত বিশ্বের সেরা চারটি মহা কাব্যের দুইটি। মহাভারতের কাহিনীর কেন্দ্র স্থল কুরুক্ষেত্র দর্শনের উদ্যেশে দিল্লি থেকে দুপুরের খাবারের পর রওয়ানা দিলাম। দূরত্ত্ব ১৬০ কি মি। ঐতিহাসিক পানিপথের উপর দিয়ে যেতে হয়। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই। কিন্তু পানি পথ অতিক্রম করার সময় আমার গা ছমছম করছিলো। এই পানি পথের প্রান্তরে ১৫২৬, ১৫৫৬, ও ১৭৬১ সালে যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল তার বর্ণনা দেয়া এখানে সম্ভব নয়। আমার বিশ্বাস কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ভারতের ইতিহাসে এত বেশী লোকক্ষয় আর কোন যুদ্ধে হয়নি।
আমি এখন আমাদের ভ্রমণ কালিন সময়ে কুরুক্ষেত্রের একটি ঘটনা বন্ধুদের অবহিত করতে চাই। পানি পথের প্রান্তর পেড়িয়ে রাত ১০টায় আমরা কুরুক্ষেত্র পৌঁছাই। প্রাচীন গুর্জর জাতির নামাংকিত গুর্জর ধর্মশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। পরদিনই আমরা কুরুক্ষেত্র প্রান্তর দেখতে যাব যেখানে কৌরব দের সাথে পান্ডব দের যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে অর্জুনের মোহ ভংগের জন্য পার্থ সারথি ভগবান শ্রীৃকৃষ্ণ যে উপদেশ দিয়ে ছিলেন তারই সাত শত শ্লোক নিয়ে শ্রীমৎ ভাগবৎ গীতা বিশ্বজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী দের পবিত্রতম ধর্ম গ্রন্থ।
আমার এই লেখাটি যেহেতু কোন ধর্মীয় আংগিকে লেখা নয় বরং একজন আনাড়ি পর্যটকের স্মৃতি কথা, তাই কুরুক্ষেত্র নিয়ে আর কথা বাড়াব না। শুধু বলছি ৪৫০০ বৎসর পূর্বের কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে এখন বিরাট বিরাট শিল্প কারখানা। তবে এরই মধ্যে কয়েক বিঘা যায়গা যেখানে থেকে পার্থ সারথি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তারঁ সখা অর্জুন কে গীতা উপদেশ করেছিলেন তাহা সংরক্ষণ করা আছে।ঐ যায়গা দর্শন করে আমরা ব্রহ্ম সরোবর নামে বিরাট এক সরোবর দেখতে যাই। কথিত আছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হবার পর পঞ্চপাণ্ডব গন এখানে এসে যুদ্ধে নিহত আত্মীয় স্বজনদের আত্মার শান্তির জন্য তর্পণ করে ছিলেন। সেই সময় থেকেই নাকি সূর্য গ্রহণের দিনে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পূন্যার্থী গন ব্রহ্ম সরোবরে স্নান করেন । বিরাট সরোবর একসাথে ৫০০০০০ (পাচ লক্ষ)লোকের স্নান এবং কাপড় বদলানোর ব্যবস্থা এখানে আছে। পরদিন আমাদের বেনারস হয়ে পুরীর দিকে যাত্রা করার কথা তাই রাতের খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। ভোর বেলায় বেরিয়ে পড়ার জন্য কেউ তাগাদা দিতে না আসায় ভাবছিলাম বোধহয় বিকালে যাওয়া হবে। ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু যাত্রী দের মনে কি যেন উৎকন্ঠা লক্ষ্য করলাম। কিন্ত কেউ কাউকে কিছু বলছেনা। কিছু টা দুশ্চিন্তা নিয়েইে ঘুমাতে গেলাম। পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই কর্তৃপক্ষের ডাক পরলো জরুরী প্রয়োজনে সবাইকে নীচে যেতে হবে। পোশাক পড়ে তৈরী হবার আগেই আবার ডাক এলো। নীচে গিয়ে দেখি পূরুষ যাত্রীদের সবাই উপস্থিত। জড়সড় অবস্থায় দুজন মহিলা যাত্রী ও আছেন তাদের কান্নাভেজা চোখ!

আমরা পৌঁছানোর পরেই একজন দাঁড়িয়ে বললেন আমাদের একজন যাত্রীকে গত রাতের আগের রাত থেকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ধ্যায় বের হয়েছিলেন আর ফিরে আসেন নি। তিনি ইংরেজি বা হিন্দি কোন ভাষাই জানেন না। শুধু সিলেটি বাংলা বলতে পারেন, লিখতে পারেন না। পাসপোর্ট ও সাথে নাই। গতকাল সারাদিন খোঁজ করেও তার কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। এদিকে এখানে ধর্মশালায় আমাদের বুকিং শেষ হয়ে গেছে। কাল অন্য দল আসবে। অন্যদিকে বানারস, পুরী ইত্যাদি শহরে আমাদের জন্য যে বুকিং দেওয়া আছে তাহা ও বাতিল হয়ে যাবে। ১০২ জন যাত্রী নিয়ে আমাদের সমস্যার কোন অন্ত থাকবেনা। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজ সন্ধ্যার মধ্যে যদি ঝামেলা বাবুর (ছদ্মনাম) কোন খোঁজ না পাওয়া যায় তবে তাকে ছাড়াই রাতে আমর বানারসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিব। এ বিষয়ে আপনাদের মতামত জানা দরকার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুবিঘা জমি যারা পড়েছেন তাড়া নিশ্চয়ই জানেন,
” বাবু যত বলে পারিষদ গন বলে তার শতগুণ “।

প্রস্তাব টি কন্ঠ ভোটে পাশ হয়ে গেল। তা শোনে মিটিং এ উপস্থিত ঝামেলা বাবুর শ্যলিকা ও স্ত্রীর কান্না বেড়ে গেল। আমি, আমার ভায়রা ভাই বিমলেন্দু দাশ ও তার কানাডা প্রবাসী বন্ধু হরিকেশ দেব তখনো কিছু বলিনি। হঠাৎ কি মনে করে আমাদের উদ্দেশ্য করে একজন বললেন আপনারা কিছু বললেন না যে? আমরা বললাম সিদ্ধান্ত তো হয়েই গেছে। আমরা এখন আর কি বলবো? তবুও তারা জোর করছিলেন আমাদের মতামতের জন্য। বিমল ও হরিকেশ চাইছিল আমি কিছু বলি। আমি বিনয়ের সাথে জানতে চাইলাম আমাদের প্রস্তাব যদি আপনাদের ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ন না হয় তখন কি হবে? তারা জানালেন যুক্তিযুক্ত হলে মেনে নিবেন। তখন আমি দৃঢ় ভাবে বললাম এভাবে আমাদের এক জন সঙ্গীকে আমরা ফেলে যেতে পারিনা। তারা বললেন এভাবে আমরা কতদিন থাকবো? এক মুহূর্ত ও নয়। তবে যাওয়ার আগে আমাদের কিছু করনীয় আছে তা আমাদের করতেই হবে নতুবা আমরা আমাদের বিবেক এবং মানবতার কাছে দায়ী থাকবো। এবং আমরা সকলে মানবতা বিরোধী অপরাধে দোষী হবো। কাজ গুলো কি জানতে চাইলে আমি বললাম ১ঃ- উনার পাশপোর্ট দেখায়ে থানায় জিডি করতে হবে ২ঃ-স্থানীয় পত্রিকায় ছবি সহ উনার পুর্নাঙ্গ তথ্য দিয়ে হারানো বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে ৩ঃ- সম্ভব হলে শহরের বিভিন্ন যায়গায় ঢোল পিটাতে হবে। তারপর যদি কোন কাজ না হয় তখন আমরা চলে যাব। প্রস্তাব টির পক্ষে এক ধরনের মৌন সম্মতি পাওয়া গেল। আমি সৃষ্টি কর্তাকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালাম।

তাৎক্ষণিক ভাবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো আজ সারাদিন আমরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তাকে খোঁজব। তাতেও যদি কোন ফল না হয় তবে আগামী কাল প্রয়োজনীয় কাজটুকু সেরে আমরা কুরুক্ষেত্র কে গুড বাই জানাব। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা সত্বেও সারা দিন লোকটির কোন সন্ধান না পাওয়াতে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। বেচারার সহধর্মিণী ও শালিকার করুণ আঁখি গুলো চোখের সামনে ভেসে উটলো। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানালাম যেন লোকটিকে আমাদের সঙ্গে করে দেশে ফিরতে পারি।

ভোর বেলা ঘুম ভাংলো মানুষের চিৎকারে। ঘরের বাইরে এসে দেখি চিৎকার তো নয় আনন্দের উল্লাস। আমাদের ঝামেলা বাবুকে পাওয়া গেছে।তাই এই হর্ষোৎফুল্লতা। সকালে পেট ভরে খেয়ে আমরা পরবর্তী গন্থব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

আমাদের ভ্রমণের সর্বশেষ গন্তব্য ছিল পুরি। তার আগে অবশ্য নৈমিষ্যারন্য, বানারসি, ইত্যাদি দেখে যাওয়া হবে। পুরি ভ্রমণ শেষে আজ বিকেলে ই আমরা কলকাতা হয়ে বাংলা দেশের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা করবো । সব ঠিক ঠাক থাকলে আগামী তিন দিনের মধ্যেই বাংলা দেশে ফেরার কথা। সবার মেজাজ তাই অত্যন্ত ফুরফুরা। বেয়াই মহাশয় ও আমি প্রয়োজনী কিছু কেনার জন্য বাজারে গেলাম। কারণ বিকাল ৪টা থেকে প্রায় ৪৮ ঘন্টার এক টানা বাসে থাকতে হবে। জল,ঔষধ ,ফল ইত্যাদি কেনার পর বেয়াই মহাশয় বললেন, কিছু আংগুরও কিনে নেই । এত ভাল এবং সস্তা আংগুর আমাদের দেশে পাওয়া যাবেনা। তিনি এক কেজি র মতো আংগুর কিনলেন। আমি বললাম সাবধানে রাখবেন এখানে বানর আছে। আমার বেয়াই মশাই উত্তর দিলেন আপনার যতসব উৎভট চিন্তা। বাজার ভর্তি লোক এখানে বানর আসবে কোথা থেকে? আমি আর কথা না বাড়ায়ে হাটতে শুরু করলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিয়াই মহাশয়ের চিৎকার। বানর! বানর —। আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি বেয়াই মহাশয়ের আংগুর বানরের হাতে। সামনের ডান হাতে আংগুরের পুটলী নিয়ে দৌড়াচ্ছে। ততক্ষনে সে আমাদের থেকে ২০ গজ দূরে। বিয়াই মহাশয় বললেন এরকম শয়তান বান্দর তিনি জীবনে দেখেননি।

কি আর করা। যথা সময়ে অবিভক্ত ভারতের এক সময়ের রাজধানী কলকাতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম । কিন্তু মনটা সবার বাংলা দেশে। একটানা ২৭/২৮ দিন ভ্রমণ। কখনো দিনে, কখনো দিন রাত। তার পর ও সবাই ভাল আছে। এখন একটাই কামনা সুস্থ ভাবে যার যার ঘরে ফেরা। বিদায়ের দিন সকাল বেলা কলকাতা থেকে রওয়ানা হয়ে পরদিন ১.৩০মি নিরাপদে সিলেট পৌঁছে যাই। যাত্রা তো শেষ কিন্তু আমার ঝামেলা বাবুর কথা কি আপনারা ভুলে গেছেন? তার সাথে আমার কথা হয়নি। কারন তিনি অন্য গাড়ীতে ছিলেন । তবে তার সহধর্মিণী ও শালিকাকে দেখেছি ২/১ বার। আমার প্রতি তাকিয়েছেন অনেকটা দরদ মিশানো চাহনি। বেচারা অত্যন্ত নীরিহ মানুষ । জাতিতে শীল। ঢাকা দক্ষিণ বাজারে চুল কাটার দোকান তার। আমাদের গাড়ী দুখানা সিলেটে এসে থামলো। যাত্রীদের স্বজনেরা ভীড় করেছেন সবাইকে স্বাগত জানাতে । বাস্ক পেটরা নামানো। দীর্ঘদিনের পথ চলার সাথে বিদায় নেয়া। সবাই ব্যস্ত । ঠিক এই সময় ঝামেলা বাবু আমার দিকে এগিয়ে এসে নমস্কার জানালেন এবং বললেন আমার সাথে তার কিছু কথা আছে। আমার সন্দেহ হলো হয়তো ভাড়ার টাকা শেষ হয়েছে কিছু ধার চাইবে। আমার মিসেস কে বললাম বাংলা দেশী টাকা আছে?সে জানাল আছে। আমি আমার বাস্ক পেটরা গাড়ীতে উঠায়ে আমার ভাইপো মিথুনের সাথে মিসেস কে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে বললাম, বলুন দাদা। তিনি বললেন একটু দূরে আসুন। সবার সামনে বলা যাবেনা।

তখন আমার ধারণা বদ্ধমূল হলো উনি টাকা চাইবেন। মনে মনে অন্ততঃ তিনজনের ঢাকা দক্ষিন পর্যন্ত ভাড়ার টাকা দিবার জন্য প্রস্তুত থাকলাম। কিছুদূরে একটি নিরিবিলি যায়গায় গিয়ে বললাম এখন বলুন। তিনি আমার একটি হাত দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললেন । আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ । ধর্মকর্ম করার জন্য আমার স্ত্রী এবং শালিকাকে নিয়ে আপনাদের সাথে ভারতে গিয়ে ছিলাম । বিপদেও পড়েছিলাম। সকলের সহযোগিতায় ফিরে এসেছি । আমার স্ত্রী ও শ্যালিকা আপনার কথা বলেছে । তাড়া আপনার জন্য ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করেছে। আপনি উপস্থিত না থাকলে নাকি ওরা আমাকে ফেলেই চলে আসতো।আপনি আমাদের জন্য যা করলেন সে ঋণ আমি ও আমার পরিবার এই জীবনে শোধ করতে পারবনা। আমি মূর্খ মানুষ। আপনাকে আমি কি বলে বোঝাব আমার মনের কথা । ভগবান আপনার মংগল করবেন। এই কথা বলেই দু হাত জোর করে নমস্কারের ভংগীতে বিদায় নিলেন। আমি ও আমার ঘরে ফিরে এলাম। তীর্থযাত্রায় আমি কোন ফল অর্জন করেছি কিনা জানিনা তবে ঝামেলা বাবু এবং তার পরিবারের আন্তরিক ল শুভকামনা আমার উপর আছে এটাই কম কিসের ?

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

dak

তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে (চার) ………. নীরেশ চন্দ্র দাস

প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার একটিপ্রখ্যাত জনপ্রিয় গান — “ঠিকানা না রেখে ভালই করেছ বন্ধু, না ...