Home / Breaking News / কেলেঙ্কারিতে একা হয়ে পড়েছেন জাবি ভিসি

কেলেঙ্কারিতে একা হয়ে পড়েছেন জাবি ভিসি

সংবাদ পরিক্রমা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমিশন কেলেঙ্কারিতে’ জড়িত থাকার অভিযোগে ভিসিকে প্রত্যাখ্যান ও অবাঞ্ছিত করে পদত্যাগ দাবি করেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অনেকদিন ধরে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসা ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’- ব্যানারের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা বুধবার এই ঘোষণা দেন। শিক্ষকদের বিভিন্ন মহল বলছেন প্রশাসনের অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণ ও ভিসি’র ‘একগুঁয়েমি’ আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছেন।

শুরুতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে রবীন্দ্রনাথ হলের তিন পাশ থেকে হল সরানো, মাস্টারপ্ল্যান রিভাইসড করাসহ বেশকিছু দাবি নিয়ে আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনের একপর্যায়ে প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তিনমাস সময় নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান রিভাইসড করার আহ্বান জানান। কিন্তু সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং প্রশাসনপন্থি শিক্ষকরা আন্দোলনকারী শিক্ষকদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। এছাড়া ছাত্রলীগ আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কথা বলার সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উচ্চবাচ্য করেন। এসবকে আলোচনা বানচালের ‘ষড়যন্ত্র’ ও প্রশাসনিক অনাগ্রহ হিসেবে নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে আলোচনার একপর্যায়ে বামপন্থি এক ছাত্রনেতাকে ভিসি ব্যক্তিগতভাবে ‘কটূক্তি’ করেন। এরপরে দাবি নিয়ে ফের আন্দোলন চললে নির্মিতব্য হলের নির্ধারিত স্থানের গাছ না কাটার প্রতিশ্রুতি দিলেও ভিসি সেই কথা রাখেননি। এই আন্দোলন চলাকালেই ছাত্রলীগকে অনৈতিকভাবে ২ কোটি টাকা দেয়ার অভিযোগ ওঠে ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে সাংবাদিকরা ২ কোটি টাকার অনৈতিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন করতে গেলে ভিসি’র কার্যালয়ে লাঞ্ছিত হন ২ জন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক।

অন্যদিকে ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানী ও জাবি ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসাইনের ফাঁস হওয়া আলোচিত ফোনালাপ পরিস্থিতির নতুন মোড় দেয়। সেই ফোনালাপে ভিসি’র কাছে ছাত্রলীগ ১ কোটি টাকা কমিশন পেয়েছে বলে রাব্বানীকে সাদ্দাম হোসাইন জানান।

আবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিসি’র কথোপকথন সাক্ষাৎকারে বলা ও টিভি চ্যানেলে ছাত্রলীগের ৬% কমিশন চাওয়ার কথা বলায় ভিসি’র উপর নাখোশ হন নিজ দলের শিক্ষকরা। বিশেষ করে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে আসা শিক্ষকরা এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অন্যদিকে পত্রিকায় সাক্ষাৎকারের বিষয়ে ভিসি-ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী শিক্ষককে দুষছেন অন্য শিক্ষকরা। আন্দোলনে ভিসিপন্থি ২/১ একজন শিক্ষকের ‘ইন্ধনের’ গুঞ্জনও আছে।

দুই প্রো-ভিসিদ্বয়, ট্রেজারার প্রশাসনের গুরুত্বপূূর্ণ ব্যক্তি হলেও প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক আমির হোসেন ভিসি বিরোধী বলে পরিচিত। অন্যদিকে প্রো-ভিসি (শিক্ষা) শারীরিকভাবে খুব একটা ‘ফিট’ না। ট্রেজারার অধ্যাপক মনজুরুল হক রাজনৈতিক বিষয় মোকাবিলা করতে চান না। ফলে হাতেগোনা ১০-১২ জন শিক্ষক ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলার রাজনৈতিক বলয় পাচ্ছেন না ভিসি।

গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ১১৩ জন আওয়ামীপন্থি শিক্ষক ভিসি’র সঙ্গে যোগ দিলেও তাদের ভিসি মূল্যায়ন করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই শিক্ষক গ্রুপের নেতারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তাদের ক্ষোভের কথা জানান দিলেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অন্যদিকে নতুন প্রশাসনিক পদে পদায়নে তাদের চরমভাবে ‘অবমূল্যায়ন’ করা হয়। শিক্ষকদের দাবি তারা চারটি অলিখিত শর্তে ভিসি’র দলে যোগ দিয়েছিলেন। যদিও ভিসিপক্ষের শিক্ষক নেতা অধ্যাপক বশির আহমেদের দাবি তারা ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সামনে রেখে বিনাশর্তে এক হয়েছিলেন।’

আন্দোলনের শুরুতে নতুন যোগ দেয়া শিক্ষকরা এতদিন ভিসি’র সঙ্গে প্রচ্ছন্নভাবে থাকলেও ফোনালাপ ফাঁসের পর তাদের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি হয়। এদিকে এই সপ্তাহে তাদের নিজেদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। বৈঠকের সূত্র বলছে, ‘যেহেতু দুর্নীতির অভিযোগ ভিসি’র পরিবারের বিরুদ্ধে ফলে সেই অভিযোগের দায় রাজনৈতিকভাবে নিতে চান না তারা।’

এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষক ও সাবেক ভিসি ও বর্তমান এক প্রো-ভিসি’র ফোন নম্বর বন্ধ করে দেয়ার কারণেও আন্দোলনে নতুন হাওয়া লেগেছে। বিশেষ করে সাবেক ভিসি ও ওই প্রো-ভিসি অনুসারী শিক্ষকরা এটাকে ‘ব্যক্তিগতভাবে’ নিয়েছেন। এই প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার ভিসি পদত্যাগ দাবির মিছিলে তাদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়।

এদিকে বুধবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেশ উচ্চবাচ্য হয় ভিসি’র সঙ্গে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে ভিসি’র প্রতি অবিশ্বাস ও বিভিন্ন ইস্যুতে তার ‘ডাবল স্টান্ডার্ডকে দুষছেন সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান। তাদের অভিযোগ, ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম এতদিন অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের কথা অস্বীকার করে এলে তিনি গণমাধ্যমে বলেছেন ছাত্রলীগের চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে টেন্ডারের শিডিউল ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রশাসন কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেননি।

এছাড়া ছাত্রলীগের বিদ্রোহী গ্রুপ গণমাধ্যমে ১ কোটি টাকা ঈদ সালামি পাওয়ার কথা বলে দেয়ায় আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। আন্দোলনকারীরা বলছে, ‘এই ধরনের ঘটনার পর ভিসি তার পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।’
এদিকে ছাত্রলীগের ভাঙন ও হলে হলে আগ্নেয়াস্ত্রের মজুত মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছে প্রশাসনের। টাকা ভাগাভাগির পর থেকেই শাখা ছাত্রলীগ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চল লাপাত্তা। ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেক্রেটারি গ্রুপের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমানে প্রশাসনের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন তিনি। অভিযোগ আছে তিনি ভিসি-বিরোধী শিক্ষকদের ইন্ধনে চলছেন। অন্যদিকে হলগুলোতে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুত রয়েছে। যেকোনো সময় ছাত্রলীগের মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সব মিলিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছেন ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম।

তবে রাজনৈতিক সংকটের কথা স্বীকার করে ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘সংকট তো আমি বানাই না। যারা আমাকে চাচ্ছে না, আমাকে অনির্বাচিত, অগণতান্ত্রিক ভিসি বলে রিট করেছিল তারা তো আছেনই। তারা এখন আমাকে সততার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দিচ্ছেন। ডান-বাম ও বিএনপি’র সঙ্গে মিশে গেছেন। এখানে বুঝতে হবে তারা ন্যায় সন্ধান করছেন নাকি অন্যকিছু। যা পেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।’ সূত্র: মানবজমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মেননের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক হবে : তথ্যমন্ত্রী

সংবাদ পরিক্রমা: ক্যাসিনো থেকে চাঁদা নেয়ার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ ...