Home / Breaking News / কান্নার জল থামাতে সজীবকে নিয়ে এলো পুলিশ

কান্নার জল থামাতে সজীবকে নিয়ে এলো পুলিশ

01

হাফিজুর রহমান : এক মা কেঁদে ফিরছেন গত দু’বছর ধরে। তার আদরের সন্তান হারিয়ে গেছে। কবিরাজ, ফকির, কুফরী কালাম থেকে শুরু করে কোন কিছু বাকি রাখেনি। থানায় জিডি, এলাকায় মাইকিং, পোস্টারিং কিছুই নেই বাকি। পুলিশ আশে-পাশের থানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পত্র প্রেরণ ও খোঁজ খবর নিয়েও কুল কিনারা করতে পারেনি। এক ফকির ঠিকানা দিয়েছিল, সেখানেও গিয়েছিল, কিন্তু যায়নি পাওয়া। এক কবিরাজ তাবিজ দিয়েছিল, ঘরের সামনে মাটির নিচে পুতে রাখলে ছেলে ফিরে আসবে এক সপ্তাহের মধ্যে। এরপর সপ্তাহ, মাস, বছর চলে গেছে দুইটি, কিন্তু ফিরে আসেনি ছেলেটি। মায়ের চোখের জল শুকিয়েছে, বাবাও প্রায় অন্ধ। অভাবের সংসারে যে আলোর মশাল জ্বালিয়ে ঘর আলো করে এসেছিল ছেলেটি তা নিভে গেছে বছর দুই হলো। সে আলো জ্বলবে না আর কখনও, সেই ভাবনায় রাতের ঘুম গিয়েছে হারিয়ে বাবা মায়ের চোখ থেকে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন বেগুনবাড়ি এলাকায় বসবাস চল্লিশোর্ধ্ব ফারুখের। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সুখের সংসার। টিনশেডের দুই রুমের ভাড়া বাসা। ভাঙ্গাড়ির ব্যবসা করেই চলে যায় তার সংসার। বড় ছেলে সজীব কিছুটা মানসিক অপরিপক্ক। সমবয়সীদের তুলনায় কোন কিছু বুঝতে বা আত্মস্থ করতে সময় লাগে তার। আবার স্মৃতি শক্তিও অত্যান্ত দুর্বল। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ, বিকেলে মশার কয়েল কিনে আনতে সজীবকে দোকানে পাঠায় তার বাবা। এরপর আর ফিরে আসেনি সজীব। রাতেই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় সাধারন ডায়েরী করেছিল ফারুখ। পোস্টারে তদন্তকারী পুলিশ অফিসারের মোবাইল নম্বর দেয়া হয়েছিল। অপেক্ষা যদি কেউ ফোন করে। সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের কাছে সজীবকে খুঁজে না পাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠলো এসআই মার্গুব তৌহিদ। একপর্যায়ে নিখোঁজ সজীবকে প্রায় ভুলেই গেল সবাই। শুধু ভুলতে পারলো না পুলিশ। প্রাত্যহিক কাজের মধ্যেই পত্র-পত্রিকা, ফেসবুকে নিয়মিত সজীবকে খুঁজে ফেরে এসআই মার্গুব তৌহিদ। প্রতীক্ষায় থাকে একটা ফোন কলের।

02

৮ নভেম্বর, ২০১৮। তেজগাঁও বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তদন্তাধীন মামলার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার ফাঁকে এসি সালমান হাসান স্যারের চোখ আটকে যায় একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে। রেললাইনের প্ল্যাটফর্মের পাশে বসে ভিক্ষার থালা নিয়ে বসে আছে, এমন একজনের অস্পষ্ট ছবি পোস্ট করে Kashem Mia নামের একজন। স্ট্যাটাস দিয়েছে, ‘ছেলেটার বাপ মা কই আল্লাহ জানে। খুব কষ্টে আছে সে’। মূহুর্তের মধ্যে এসআই মার্গুব তৌহিদকে ও সজীবের মা-বাবাকে ফোন করে ডেকে আনা হলো। ছবি দেখে সজীব বলে সনাক্ত করলেন তার মা-বাবা। ফেসবুকে যোগাযোগ করা হলো Kashem Mia নামের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়া সেই ব্যক্তির সাথে। Kashem Mia প্রথমে অস্বীকার করলেন, এরকম কোন স্ট্যাটাস দেননি তিনি। পরে সেই স্ট্যাটাসটিও ডিলিট করলেন। পুলিশ পরিচয়ে কথা বলার পর ডিএকটিভ করলেন তার ফেসবুক আইডি।

প্রায় দুবছর পর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার যে স্বপ্ন দেখছিল তার মা-বাবা, নিমিষেই হয়ে গেল দুরাশা। Kashem Mia’র পোস্ট করা ছবি নিয়ে এসআই মার্গুব তৌহিদ গেল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টারের কাছে। ছবি দেখে জানালেন, ‘এটি জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনের ছবি’। এসআই মার্গুব তৌহিদ ও এসআই নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার একটি টিম চলে গেল জামালপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায়। কেউ কোন তথ্য দিতে না পারলেও প্রায় ষাট বছর বয়সী এক মহিলা ভিক্ষুক ছবি দেখে জানালো, ‘এই পোলাডা সারাদিন চিককুর দিয়া কানতো। মাসখানেক আগে কাগজ কুড়ানি এক দাড়িওয়ালা বুইড়া ব্যাটার লগে গ্যাছে’।

রাসেল নামের ১০-১১ বছর বয়সী এক শিশু পুলিশ দলকে জামালপুর শহরের পুরাতন কাগজ ক্রেতা সালাম মোল্লার কাছে নিয়ে যায়। সালাম মোল্লা সজীবের ছবি দেখে চিনতে পারে। কাগজ আলী নামের একজন বৃদ্ধ পুরাতন কাগজপত্র বিক্রি করতে তার দোকানে আসতো এই ছেলেকে নিয়ে। তবে বেশ কিছুদিন থেকে কাগজ আলীকে আর দেখা যাচ্ছে না এলাকায়। সালাম মোল্লা অনেক কাগজ পত্র ঘেঁটে কাগজ আলীর মোবাইল নম্বর দেয়। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় কাগজ আলীর ব্যবহৃত মোবাইলের অবস্থান পাওয়া যায় গাজীপুরের এরশাদনগর বস্তি এলাকায়।

তাৎক্ষনিকভাবে পুলিশ দল চলে যায় গাজীপুর এরশাদনগর বস্তি এলাকায়। বেশী দামে কাগজ বিক্রির অফার পেয়ে কাগজ আলী দেখা করতে রাজী হয় তাদের সাথে। তারপর কাগজ আলীর ভাড়া বাসায় গিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় সজীবকে। কাগজ আলীর বয়স ষাটের কাছাকাছি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাঁচার জন্য বিয়ে করেনি আর। ১০ বছর বয়সী ছেলের মৃত্যু হয় ট্রেনে কাটা পড়ে। এরপর কাগজ কুড়িয়েই পার করতে চেয়েছিল বাকি জীবন। জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভিক্ষার থালা হাতে কাঁদতে থাকা সজীবকে দেখে পিতৃ স্নেহ জাগ্রত হয় তার হৃদয়ে। একপর্যায়ে সজীবকে নিয়ে পালিয়ে আসে গাজীপুরে, পিতৃস্নেহে তাকে বড় করার উদ্দেশ্যে।

সজীব জানায়, মশার কয়েল কেনার জন্য বাসা থেকে বের হওয়ার পর কেউ একজন কম দামে বেশী কয়েল পাওয়া যাবে বলে নিয়ে যায় তাকে। এরপর আর কিছেই মনে নেই তার। তাকে দিয়ে করানো হতো ভিক্ষাবৃত্তির কাজ। মানসিক অপরিপক্ক থাকায় বাবা-মায়ের নাম ছাড়া আর কিছুই বলতে পারতো না সে। পুলিশের এমন কাজে খুশিতে আত্মহারা সজীবের পরিবার। সজীব ফিরে পেল তার অস্তিত্বের ঠিকানা। মায়ের চোখের কান্নার জল এবার থেমে গেল পুলিশের প্রচেষ্টায়। এমন সজীবেরা সজীব থাকুক বাবা-মায়ের সান্নিধ্যে, মায়ের চোখের জল আর না ঝরে, এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

পুলিশ কর্মকর্তার ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

sri

শ্রীলঙ্কায় গীর্জায় আবারও বিস্ফোরণ

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর একটি গীর্জায় নতুন করে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সোমবারের এই বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন ...