Home / Breaking News / ঈশ্বর কী মঙ্গল দেখতে পেলেন?

ঈশ্বর কী মঙ্গল দেখতে পেলেন?

ফাইল ছবি।

অঞ্জনা দত্ত: প্রায় ৩০ বৎসর আগে পি কে ডি’র একজন বিজনেস পার্টনার তাঁর স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন। ভাবি বয়েসে আমার ছোট ছিলেন। কতটা ঠিক জানি না৷ প্রথম সন্তান তখন মাত্র এস এস সি পাশ করে কলেজে এডমিশন নিয়েছিল। দ্বিতীয় সন্তানটি, ছেলে, মাত্র চার বৎসর বয়েস। ভাবির বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়েসে। খুব সম্ভবত ক্লাস টেনে পড়ার সময়। সেই ভাবি মাস্টার্স কমপ্লিট করেছিলেন। ১৯৯০ সালে অক্টোবর মাসে একরাতে পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে নগরীর এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন এরশাদ শাহীর শাসনামল ছিল। ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে চলমান এরশাদ বিরোধী আন্দোলন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য শহরে বিক্ষিপ্তভাবে হিন্দুদের মন্দির ভাঙ্গা হচ্ছিল। কোথাও কোথাও চলেছিল লুটপাট। রাতে কারফিউ থাকত। ভাই দেশে না থাকা সত্ত্বেও তাঁর অন্য পার্টনাররা তাঁদের সাধ্যমত ভাবির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। অপারেশন করা হলো। কিন্তু চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ভাবিকে বাঁচানো গেল না। সেই রাতে ভাই হংকং থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছালেন। হাসপাতালে পা রাখলেন আর তখনই ভাবির প্রাণপাখি উড়ে গেল। এতগুলো কথা লিখলাম অন্য কারণে।

৩০ বৎসর আগে দেশে যাতায়াত ব্যবস্থা আজকের মত সুগম ছিল না। তখনও বঙ্গবন্ধু সেতু হয়নি৷ রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছানো চাট্টিখানি কথা ছিল না। ভাবির মা নাটোর থেকে এসে পৌঁছালেন যখন তখন ভাবির মরদেহ দাফন করার জন্য নেয়ার প্রস্তুতি চলছিল৷ হঠাৎ শুনলাম কে যেন বলছে ভাবির মা এসেছেন। আর তখনই কানে এল এক সন্তানহারা মায়ের আহাজারি! ” আল্লাহ সবাই বলে তুমি নাকি যা করো মঙ্গলের জন্য কর। তুমি এর মাঝে কী মঙ্গল দেখতে পেলে? ” ৩০ বৎসর আগে শোনা ভাবীর মায়ের এই বিলাপ আজও যেন স্পষ্ট শুনতে পাই। বিশেষ করে অকালে কেউ চলে গেলে!

ঈশ্বরে আরও একবার বিশ্বাস হারাই ২০০৮ সালে যখন আমাদের সাত ভাইবোনের সবার ছোট ভাইটি ৪৮ বৎসর বয়েসে চলে গেল না ফেরার দেশে। বাবা মা তখনও বেঁচে। আমি বলি ঈশ্বর বাবা মায়ের বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটিকে ঝরিয়ে নিলেন। এর চেয়ে কম বয়েসেও অনেকে চলে গেছেন। পারভিন ভাবির বয়স অনেক কম ছিল। কিন্তু আমার ভাইয়ের যে একটি অবোধ অসুস্থ শিশু রয়ে গেছে! আমার ভাই এর বৌ কীভাবে সামলাবে শিশুটিকে। ঈশ্বর তো সর্বজ্ঞ! তিনি বোঝেন না এইরকম শিশু বাবা ছাড়া বড় হতে পারে না? অথচ তাঁর একফোঁটা মায়াদয়া হলো না ভাইটিকে নিয়ে যেতে! জ্ঞানত দেখিনি মা বাবাকে কোন অন্যায় আচরণ করতে। কারও অপকার করতে। শেষ বয়েসে এটি তাঁদের প্রাপ্য ছিল? এ কেমন বিচার! কত কত ঋণখেলাপী, ঘুষখোর, সমাজকে নষ্ট করার কীট দিব্যি বেঁচে আছে। ভুল বুঝবেন না। কারও মৃত্যু কামনা করছি না। কিন্তু বেছে বেছে যাদের আরও অনেকদিন বাঁচার প্রয়োজন তাদের কেন নিয়ে যান সৃষ্টিকর্তা?

এর ছয় বৎসর পরে ঘটল আর একটি অপরিমেয় ক্ষতি। হারালাম আমাদের সবার ছোট ভাগ্নে সৃজনকে। মাত্র সাড়ে সতের বৎসর বয়েসে। সৃজনের মা বাবা যে কতটা পরোপকারী সেটি যারা তাদের চেনে তারা বলতে পারবে। এদের মুখে সর্বদা হাসি লেগেই থাকত। ঈশ্বর হয়তো বা ভাবতেন হাসব তো আমি। তোরা হাসার কে? কে জানে! ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনুপস্থিতি নিয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। আজও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াই ” ঈশ্বর তুমি এরমধ্যে কী মঙ্গল দেখলে “। আজ কতগুলো বছর বুকের ভিতর রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে। সৃজনের স্মরণে মাসখানেক আগেও ডাঃ পান্নালাল সাহাসহ খাগড়াছড়িতে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প করে এসেছি। ২০১৪ এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় সৃজনের স্মৃতির স্মরণে যতগুলো মেডিক্যাল ক্যাম্প হয়েছে, সব কয়টায় পান্নাদা ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওষুধ যোগাড় করা, ডাক্তার যোগাড় করা সব দায়িত্ব পান্নাদার। চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ রোটারি ক্লাব খুব সম্ভবত ২০০০ সাল থেকে ঠোঁটকাটা তালুকাটা গরীব দুঃস্থ রোগীদের বিনামূল্যে অপারেশন করা শুরু করে। এর প্রাণপুরুষ ছিলেন দাদা। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নড়াইল, যশোর, নরসিংদি আরও অনেক জায়গায় পান্নাদা তাঁর টিম নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন গরীব রোগীদের পাশে দাঁড়াতে। বিনিময়ে কী পেলেন? একটি অবোধ, অটিস্টিক ছেলের মাকে হারানো? এত এত কাজের বিনিময়ে নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানো ছিল তাঁর অদৃষ্ট লিখন? কী মঙ্গল দেখতে পেলেন এতে ঈশ্বর নাম্নী সর্বশক্তিমান!

কাল বিকাল থেকে আমরা নিজের মাঝে নেই। দিন কয়েক আগে কিছু পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য ভারতে গিয়েছিলাম৷ পি কে ডি দেশের বাইরে গেলেও অনেক সময় পান্নাদার সঙ্গে কথা বলে। দুইদিন আগে ফোন করতে যেয়ে জানল বিউটি বৌদির Massive Haemorrhagic Cerebral Stroke করেছে। দাদারা তখন মাগুরায় নিজেদের বাড়িতে ছিলেন৷ কালবিলম্ব না করে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন৷ অপারেশন হয়েছে ( পি কে ডি যেদিন কথা বলল ঐদিনই)। দাদা মনে করছেন অপারেশন ঠিকঠাকই হয়েছে। শুনে আমরা দুজনেই হতভম্ব হয়ে পড়লাম। তবে আশা হারাইনি। রাতেও কথা বলল পি কে ডি৷ তখনও ততটা হতাশ ছিলেন না দাদা। গতকাল সকালবেলায় যখন কথা বলতে গেল তখন দেখল পান্নাদা চরমভাবে হতাশ। ব্রেইন ড্যামেজ এতটা হয়েছে… অন্য হাসপাতালে ট্রান্সফার করা… করা সম্ভব হবে কি না…
ভগবান তুমি কী সত্যি আছ? আর আছ ভালো মানুষদের কষ্ট দেয়ার জন্য?

বেলা দুইটা আড়াইটা নাগাদ আখাউড়া সীমান্ত পার হয়ে গাড়িতে উঠে পি কে ডি পান্নাদাকে ফোন করল। কেন জানি বলে উঠলাম অন্য কাউকে ফোন কর৷ না। পি কে ডি পান্নাদাকে ফোন করল। পান্নাদা ফোন কেটে দিলেন। এরপর দাদার আত্মীয় এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করলেন। তিনি দাদার সঙ্গেই ছিলেন। পূর্নেন্দুদা জানালেন বিউটি বৌদি আর নেই। কিছুক্ষণ আগে…
সেই থেকে এখন পর্যন্ত বুকের ভিতরটা কেমন যেন ভারি হয়ে আছে। ঈশ্বর এখানে তুমি কী মঙ্গলটা দেখতে পেলে? এই অসুস্থ ছেলেটির কী হবে? কে সামলাবে তাকে? বৌদির যে কাজ ছিল একটাই৷ ছেলের পিছনে লেগে থাকা৷ এই নিষ্পাপ ছেলেটি কী অন্যায় করেছিল যে তাকে এত বড় শাস্তি পেতে হলো? কেন এত নিষ্ঠুর তুমি? পান্নাদার নিঃস্বার্থভাবে মানবসেবার এই পুরষ্কার? এরপরেও তোমার বন্দনা করে যেতে হবে? জানি না। কিছু বুঝি না।

ছেলেকে রেখে বিউটির কোথাও যাওয়া হতো না বিশেষ। যদি কখনও মাসীমা মেসোমশাই ( বিউটির মা বাবা) সময় করতে পারতেন তাহলে কোথাও থেকে দু চার পাঁচদিনের জন্য বেড়িয়ে আসত। সেভাবে একবার আমরা দুই দম্পতি বালি আর ভিয়েতনাম গিয়েছিলাম। বিউটি যে কী পরিমাণ উপভোগ করেছিল বলার নয়। বালি আর ভিয়েতনামে পি কে ডি আগেও গিয়েছিল৷ আর তাছাড়া কোথাও যাওয়ার আগে পি কে ডি বইপত্র ঘেঁটে সেসব জায়গা সম্পর্কে একটা ধারণা নিয়ে রাখে। তাই কোথাও গেলে হাতড়াতে হয় না৷ বিউটির খুব পছন্দ হয়েছিল দাদার সঙ্গে বেড়িয়ে। সবসময় বলত প্রদীপ দার সঙ্গে বেড়ানো খুব মজা। নিজেদের কোন চাপ নিতে হয় না। খুব ইচ্ছে ছিল আফ্রিকায় যাওয়ার৷ আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন সম্ভব হয়নি নানা কারণে। কিন্তু পি কে ডি কথা দিয়েছিল ওদের নিয়ে আফ্রিকা থেকে বেড়িয়ে আসবে। দুবাই যেতে চেয়েছিল। ” ও দাদা, আমাকে একবার দুবাই নিয়ে যাবেন। দাদা আমি কিছু কিনব না। আমার খুব সখ দুবাই দেখার। ” পি কে ডি কথা দিয়েছিল বিউটিকে দুবাই নিয়ে যাবে। পান্নাদা হাসতেন বৌ এর আবদারে। দুই চার বৎসরে বিউটি হয়তোবা একফালি সূর্যের আলো দেখতে পেত। তখন সে খুশিতে ঝলমল করে উঠত। দেখে মনে হতো না কী লড়াইটা তাকে করতে হতো প্রতীককে নিয়ে! এতকিছুর পরেও ব্যালকনিতে সুন্দর বাগান করেছিল৷ শুটকি বানাত নিজেরা৷ নোনা ইলিশ তৈরি করত নিজে হাতে। কী সুন্দর জলপাই এর আচার বানাত! দেখে মনে হতো মিষ্টি — কালো জাম! আজ বিউটি সবকিছুর উর্ধ্বে চলে গেছে৷ রেখে গেছে একরাশ স্মৃতি… তার মাখন মাখন গায়ের রঙ, কপালে লাল ফোঁটা, সিঁথিতে সিঁদুর, মুখে হাসি৷ আর আমার মাথায় কাল বিকেল থেকে ঘুরছে ঈশ্বর তুমি মঙ্গলের জন্যই সব করো। বিউটিকে নিয়ে যাওয়ার মাঝে কোন মঙ্গল নিহিত আছে? একবার বুঝতে দেবে?

পুনশ্চ ঃ পান্নাদা আপনার অনুমতি ছাড়াই লিখলাম। ক্ষমা করে দেবেন। নিজেকে সামলাতে পারছি না৷ চেষ্টা করবেন ধৈর্যহারা না হতে। কার কাছে প্রার্থনা করতে হয় জানা নেই। যার চরণে আমরা মাথা ঠুকি আজ পারলাম না তাঁর কাছে কিছু চাইতে। যদিও জানি এই অভিমানের কোন মূল্য নেই তাঁর কাছে৷ তিনি তাঁরটা করেই যাবেন।

অঞ্জনা দত্ত এর ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

খালেদা জিয়ার বিষয়ে বারবার কথা বলার সময় নেই : সেতুমন্ত্রী

সংবাদ পরিক্রমা: দেশ ও দলের অনেক কাজ আছে, খালেদা জিয়ার বিষয়ে বারবার কথা বলার সময় ...