Home / ফেইসবুক কর্নার / আমার মন কেমন করে ………………… অঞ্জনা দত্ত

আমার মন কেমন করে ………………… অঞ্জনা দত্ত

কে জানে, কে জানে, কে জানে, কাহার তরে… ‘ এমন অনুভূতির সন্মুখীন মনে হয় কমবেশি সবাই হয়। কেন মানুষের মনের স্থিরতা নেই? সবার কথা বলছি না৷ তবে যারা এমন মানসিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন, সেখানে কিছু না কিছু সমস্যা অবশ্যই আছে। আর সেটি যে শুধুই পরকীয়ার কারণে তা ভাবলে হয়তো বা এই আপাত নিঃসঙ্গ মানুষটির প্রতি অবিচার করা হবে। তাহলে কেন তার মন ‘কেমন করবে ‘? কিসের অভাব? জীবনসঙ্গীর অবহেলা? অসম্মান? এটি একটি পয়েন্ট হতে পারে। কেননা আমাদের সমাজে স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হয় এটি কমজনই বোঝে। স্বামী অর্থ হলো প্রভু৷ কাজেই সে এই নিয়ে ভাববেই না৷ তদুপরি জ্ঞান হওয়া পর্যন্ত সে দেখে এসেছে মায়ের ওপর বাবা ছড়ি ঘোরাচ্ছে, বড়ভাই ছোট বোনের ওপর… তাহলে একজন পুরুষ যখন স্বামীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখন সেও হয়ে ওঠে কোন একজনের দন্ডমুন্ডের কর্তা! সে কখনোই ভাবে না একটি সংসার সুন্দর করতে হলে স্বামী স্ত্রী দুজনেরই সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। শুধুমাত্র সমাজের কাছে পরিচয় দেয়ার জন্য শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করা নয়, সেই মেয়েকে তার শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশে সহায়তা করা একজন আধুনিক এবং মার্জিত রুচির স্বামীর উচিৎ।

আজ নীলার হয়েছেটা কী? সব কাজ ফেলে সমাজ নিয়ে ভাবতে বসেছে? সে একা এই পচনশীল সমাজের পরিবর্তন কতটুকু করতে পারবে? যে সমাজ একদা নারীদের স্বামী মারা গেলে তার সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করত, যে সমাজ নারী স্বামী হারালে তার চলাফেরা, খাওয়া দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করত, যে সমাজ শিশুমেয়েকে তার পিতার জাতকুলমান রক্ষার্থে শিশুটির চেয়ে ৫০ -৬০ বছরের ব্যবধানে, এমনকী অনেক সময় ঘাটের মড়ার সাথেও বিয়ে দিতে পিছপাও হতো না, সে সমাজের অনেক কিছু বদলে গেলেও সমাজপতিদের অর্থাৎ পুরুষদের মন কতটুকু বদলেছে? পুরুষরা আজও ভাবে নারী তার অধীনস্থ এক প্রাণী বটে। সে যা বলবে নারীকে তাই মেনে চলতে হবে। নারীর নিজস্ব কোন চিন্তাভাবনা, মতাদর্শ থাকতে পারে না। কোন নারীর আচরণে পুরুষের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বা ভিন্ন কিছু দেখা দিলে সেটি নিয়ে নারীকে কী জবাবদিহিতা করতে হয় না? কিন্তু কয়জন নারী পারে তার দৃষ্টিতে তার স্বামীর কোন অসঙ্গত আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করতে? কীসব সৃষ্টিছাড়া চিন্তাভাবনা নীলার?? কেন এমন হয়? তাহলে কী আসলেই নারী শিক্ষা দায়ী এজন্য? নারীদের কী শিক্ষার প্রয়োজন ছিল না? নারীদের কী উচিৎ ছিল পড়ে পড়ে মার খাওয়া! কে জানে! নীলা ভাবে আর ভাবে! কোন সদুত্তর পায় না।

তার মনে পড়ে আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতার কথা। যাকে তার পুরো জীবনে ছোট মেয়েটি ছাড়া আর কেউ বোঝেনি৷ তার এতগুলো সন্তান ছিল। তার শরীরে তিলতিল করে বেড়ে ওঠা তার আত্মজরাও যখন তাকে বুঝতে পারত না, বাপ কাকুদের সঙ্গে মায়ের সমালোচনা করতে ছাড়ত না, তখন সুবর্ণলতার বুক ভেঙ্গে যেত৷ সুবর্ণলতার স্বামীর কাছে সুবর্ণ’র শরীরের দাম ছিল। আর কিছু নয়। কখনও জানতে চায়নি সুবর্ণ কী চায়? কীসে সে খুশি হয়? কীসে তার দুঃখ? সে পর্যন্ত ভাবার মত সুবর্ণলতার স্বামীর, বলতে কী, মস্তিষ্কের কোষগুলো কাজও করত না। ঐ বাড়িতে সুবর্ণলতা ছিল সৃষ্টিছাড়া৷ তার মত করে কেউ ভাবত না। ভাবতে পারত না৷ সুবর্ণের মা সত্যবতীর কষ্ট ছিল আরও গভীর। তার স্বামীটি ছিল বৌ অন্ত প্রাণ। কিন্তু নিজের মায়ের বিপক্ষে যাওয়ার মত ক্ষমতা তার ছিল না।, সে কারণটা ন্যায্য হলেও। তাই সত্যবতীও যখন দেখল তার শিক্ষার কোন দাম নেই তার সংসারে সত্যবতী সে সংসার ত্যাগ করে চলে যেতে দুবার ভাবেনি। সেই কোন আমলের কাহিনী। তখনো সত্যবতীর মত দৃঢ় চরিত্রের নারী ছিল এই সমাজে! সত্যবতী ভুল করেছিল কী ঠিক করেছিল সে অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু তার অপমানিত হৃদয়কে সে আর অপমানিত হতে দিতে চায়নি। তাই ছোট সুবর্ণকে, মনে হয় বছর আটেকের ছিল, ছেড়ে যেতে পেরেছিল অনায়াসে। এর আর একটি কারণ হলো ঐ শিশু সুবর্ণকে তার ঠাকুরমা বিয়ে দিয়েছিল। সেই বিয়ে সত্যবতীর স্বামী আটকাতে পারেনি। নিজের শাশুড়ির ওপর আস্থা সত্যবতীর কখনোই ছিল না। যেমন সুবর্ণলতা পায়নি কোনদিন শাশুড়ির ভালবাসা, মাতৃস্নেহ। সত্যবতী বুঝেছিল সুবর্ণকে সে যেভাবে মানুষ করতে চেয়েছিল, তা যখন হবার নয়, তাহলে সে সংসারে থেকে কী হবে? তাই অভিমানে সংসার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল।

আজকের দিনে সুবর্ণলতারা কেমন আছে? নীলা কপাল কুঁচকে ভাবতে থাকল৷ আজ অবশ্য মেয়েদের লেখাপড়া বেড়েছে। আজ মেয়েদের একটা ভাল অংশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বী। কিছুটা ভাবল নীলা এই কারণে যে অনেক মেয়েকে বেতনের টাকাটা স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়। নিজের প্রয়োজনীয় খরচের টাকাটা স্বামী নামক প্রভুর থেকে চেয়ে নিতে হয়। কোন কোন মেয়ের চাকরির বেতনে তার সংসার চলে। কাজেই অর্থনৈতিক মুক্তির কথা সে ভাবতে পারে না। এটি কী জিনিস সে জানেও না। নীলা ভাবে তারা যে চাকরি করে নিজের সংসারে অবদান রাখতে পারছে এটাই বা কম কী ! শুধু কষ্ট টা এখানে যে এই অবস্থায়ও বহু স্বামী স্ত্রীর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির টাকায় অসৎসঙ্গে কাটাতে দ্বিধাবোধ করে না। আর যারা সমাজের উচ্চবিত্ত আসনে আছেন, যাদের দুই চার পয়সার চাকরির ওপর নির্ভর করতে হয় না, তাদের নীলার ভাবনার ঘরে ঠাঁই হয় না। প্রয়োজন নেই কোন পক্ষেরই। আর যে মধ্যবিত্ত অংশের নারীরা নিজ যোগ্যতায়, বাবা মায়ের উৎসাহে লেখাপড়া শেষে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন তারাই বা কতটা ভাল আছেন? তারা কী সত্যবতী, সুবর্ণলতার গন্ডি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছেন? তারা কী তাদের সংসারে যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন? একেবারে পাচ্ছেন না সেটি নীলাও ভাবে না। তবে কত শতাংশ প্রশ্ন হলো সেখানে।

আমাদের দেশে কোন কিছুরই পরিসংখ্যান ঠিকমত নেই। সেখানে সমাজে নারীদের কী অবস্থা সেটি নিরূপণ করা কতটা সম্ভব? নীলার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছিল। এটি নীলার থিসিসের বিষয় নয়। লেখাপড়ার পাট তার অনেক আগেই চুকে গেছে। সাধারণ সংজ্ঞায় নীলা উচ্চশিক্ষিতা। তার সংসারে সে অনেক অর্থে অবহেলিত নয়। অনেকটাই সম্মান সে পায়। তবু কেন জানি তার অনেক সময় মনে হয় মেয়েরা লেখাপড়া কম শিখলে হয়তো বা ভাল ছিল৷ আপনারা শিক্ষিত নারীরা তেড়ে আসবেন না৷ নীলা বলতে চেয়েছে যেইমাত্র একজন নারী পড়াশোনা করছে, তখন সে তার নিজের মত করে ভাবতে শিখছে। সে তার ‘ আমিত্ব ‘ কে চিনতে শিখছে৷ আর তখনই শুরু হয় যত গোলমাল। অনেক শিক্ষিত নারী নিজের আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে প্রভুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছে। অনেকে আমিত্বকে পুরোপুরি বিসর্জন না দিয়ে মাঝামাঝি পথ বের করে নিয়ে চলে। তাতে সে কতটা ভাল আছে বা তার যতটুকু সম্মান প্রাপ্য ছিল ততটুকু পেয়েছে কি না তা নিয়ে ততটা মাথা ঘামায় না৷ মোটামুটি সংসারের চাকা সচল রয়েছে, তার চাহিদা পূরণ হচ্ছে। পূরণ হচ্ছে সন্তানদের চাহিদা। ভাল স্কুলে পড়ানো যাচ্ছে। স্বামী নামক প্রভু বৎসরে একবার দেশের বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে। কাজেই সংঘাত কোথায়? মাঝে মাঝে দুই এক কথায় কিছু কটু কথা চলে আসে বটে! তাতে কী? দুটো হাঁড়ি থালা পাশাপাশি থাকলে একটু কী ঠোক্কর খায় না? এটিও তেমন কিছু একটা৷ সব কিছু নিয়ে ধরে বসে থাকলে চলে? না বসে থাকা উচিৎ! একদম ঠিক। জীবন তাহলে সামনে এগোত না। পিছিয়েই থাকত৷

তাহলে দাঁড়াচ্ছেটা কী? সত্যবতী হওয়া অনেক কঠিন। সোজা কোনটাই বা? সুবর্ণলতা? নাকি দীপাবলি? ঘুরেফিরে অন্য উপন্যাসের নায়িকার নাম চলে আসে। নীলা বিরক্ত হলো নিজের ওপর? এই সমাজে মেয়েরা কেন নিজেদের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে না? কেন তাদের সব সময় কারও না কারও সঙ্গে তুলনীয় হতে হয়? একধরণের বেদনাবোধ নীলাকে সবসময় ক্ষতবিক্ষত করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দেখে! এখানটায় এসে নীলা একটু থমকালো। এত সংগ্রাম করলেন রাজা রামমোহন রায়। লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলেও যেতে হয়েছিল তাঁকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিয়ে নিয়ে এত লড়লেন, লড়েছেন নারীদের শিক্ষা নিয়ে। আজকের দিনে মেয়েরা নয় নয় করেও কম এগোয়নি। এরপরেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আছর যায়নি নারীদের ওপর থেকে৷ এখনও নারীরা মানুষ হিসাবে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে পারেনি। এখনও ভোগের বস্তু হয়ে রয়েছে। কী ঘরে, কী বাইরে। তাহলে মেয়েরা কখন স্বাধীন হবে? কখন তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে? প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী অর্জনই কী বড় স্বাধীনতা? আর কোন স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই? সংসারে কোন ব্যাপারে তার কোন মতামত থাকতে নেই? তাকে সবকিছুতে শুধু হ্যাঁ বলে যেতে হবে? এমনকী নিজের সন্তানের বিষয় হলেও একজন মায়ের কোন বক্তব্য থাকতে পারে না? এটি মেনে নেয়া যায়? নেয়া উচিৎ? এতবড় অপমান যে নীলা হজম করতে পারল না। নিমিষে নীলা হয়ে গেল সত্যবতী!

কিন্তু এই যুগে যে সত্যবতী হওয়া যায় না। এযুগে হয় পড়ে পড়ে মুখ বুজে অপমান সয়ে যাও , অথবা দীপাবলি হয়ে যাও। আর যে সব পুরুষের আপাদমস্তক গুবরে পোকায় কিলবিল করছে ওরা বলবে ওঃ! ইনি? ইনি তো তসলিমা নাসরিন! হায়রে সমাজ!! নীলা সেদিকে গেল না। তবে ওর মাথায় দীপাবলি জেঁকে বসেছে। আজ বেশকিছুদিন ধরেই। কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না৷ আচ্ছা আমাদের দেশে দীপাবলিদের সংখ্যা কী নেহাৎ কম? মোটেও নয়। দিনে দিনে দীপাবলিদের সংখ্যা বাড়ছে। একটি মেয়ে নিজেকে যত বেশি জানছে দীপাদের সংখ্যা তত বাড়ছে। তবে উপন্যাসের দীপাবলি আর বাস্তবের দীপাবলিদের অনেক পার্থক্য। উপন্যাসের দীপাবলিকেও ফাইট করে চলতে হয় পারিপার্শ্বিকতার সাথে। আর রক্তমাংসের দীপাদের গায়ে অহরহ এসে বিঁধে যত তীর্যক চাহনি। নোংরা কমেন্টস চতুর্দিক থেকে… সবাই মনে করে স্বামীহীনা নারীর ওপর ওদের সবার অধিকার রয়েছে। কেমন অসহায় লাগে তখন নিজেকে… ফাইট করার এনার্জি আর থাকে না। যারা বলছে তারা খুব ভাল করেই জানে নীলা কেমন মেয়ে! কী তার জীবন যাপন সবই জানে। কিন্তু নোংরামি ছড়াতে বাধে না। এই সমাজ দীপাবলিদের স্বাধীনভাবে একা থাকতে দেয় না৷ এই সমাজ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন দীপাবলিদের সহ্য করতে পারে না। মেয়েদের এত তেজ কীসের? এই কথা যেমন একজন পুরুষ বলে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন নারীও বলবে অন্য নারী সম্পর্কে না জেনে।

নীলোৎপল যে রাতে ক্লাব থেকে এসে ঘোষণা দিল ছেলে অর্ণবকে ক্যাডেট কলেজে পাঠিয়ে দেবে, নীলার মনে হলো তার পায়ের নিচের মাটি দুলে উঠল। নীলার মাথা ঘুরিয়ে উঠল। অর্ণব মাত্র ক্লাস সেভেনে ৷ ক্যাডেট কলেজ সম্পর্কে কত রকমের কথা শোনা যায়। যদি সেগুলো সত্যি নাও হয়, ছেলেকে ক্যাডেট কলেজে দেয়ার কী আছে? ঢাকায় তো ভাল স্কুলের অভাব নেই। নীলা প্রথমটায় ভাবল ক্লাব থেকে এসেছে। এখন মাথা ভাল কাজ করছে না। পরদিন কথা বলে নেবে। ছেলেকে ক্যাডেট কলেজে দেয়ার কথা যে নীলোৎপল ভাবছে নীলা তো আগে কখনও শোনেনি৷ কখনও বলেনি তো! তাই পরদিন ব্রেকফাস্ট করার সময় নীলা ধীরেসুস্থে জিজ্ঞেস করল কাল রাতে যেন কী বলেছিলে বাবুইকে ক্যাডেট কলেজে পাঠাবে…
> হুম। বলেছি তো।
> কেন? এখানকার স্কুলে কী সমস্যা হচ্ছে? অন্য বাচ্চারা পড়ছে না?
> পড়ছে। ওদের মায়েরা দেখছে বাচ্চাকে। খোঁজখবর রাখছে। ওরা তো তোমার মত সেজেগুজে বসের মন যোগাতে রোজ সকালে ঘর থেকে বাইরে যাচ্ছে না?
নীলা চমকে উঠল নীলোৎপলের কথায়। নীল জানে নীলা একজন চিকিৎসক। একটি সরকারি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপিকা। নীল এমন কথা উচ্চারণ করতে পারল? কাল রাতের ক্লাবে যে ছাইপাঁশ গিলে এসেছে তার ক্রিয়া এখনও চলছে?
> কী বললে তুমি? এত নোংরা তোমার মন? বিয়ের আগে তুমি জানতে না আমার প্রফেশন কী?
> জানব না কেন? তবে তুমি আমার ভালমানুষির সুযোগ নেবে তা বুঝিনি৷ আর আমি বললেই নোংরা৷ তুমি করলে কোন দোষ নেই।
> তুমি ভেবে বলছ? বুঝে বলছ?
> এতে এত ভাবাভাবির কী আছে? চারপাশে দেখছি না!
নীলার রুচিতে কুলাল না আর কিছু বলতে। নীলা কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছে নীলার সম্পর্কে নীলের কথাবার্তা বদলে যাচ্ছে । রাতের সম্পর্কে যেন জানোয়ার ভর করে ওর ওপর৷ নীল তো এমন ছিল না? হয়েছে টা কী? বার কয়েক কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু নীলোৎপলই এড়িয়ে গেছে৷ ক্লাবে যাওয়া বেড়ে গিয়েছে। নীলা নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়েছে। আগে যেখানে ঘন্টা তিনেক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করত, এখন সেটা কমিয়ে এনেছে। সেটা যে নীলকে খুশি করার জন্য তা নয়। লজ্জায়, ঘেন্নায় নীলা বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিৎ! ঐ রাতের পর থেকে সে ছেলের ঘরে ঘুমাতে শুরু করেছে৷ ছেলে অবাক হয়েছে। খুশিও হয়েছে। বাপী ঠিক করেছে ওকে ক্যাডেট কলেজে পাঠিয়ে দেবে। ওর একেবারেই ইচ্ছে নেই। কিন্তু সাহস করে বলতেও পারছে না। আর নীলা দিন গুনছে অর্ণব কবে চলে যাবে হোস্টেলে।

ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষায় অর্ণব ভাল করেছে। ওকে রেখে আসতে হবে। নীলা সেদিন ছুটি নিয়েছে। ছেলের সাথে যাবে। নীলকে সেদিন কেমন যেন গম্ভীর দেখাচ্ছিল৷ আর নীলা হেসে হেসে অর্ণবের মাথার চুল এলোমেলো করে দিতে দিতে বলল আমার সোনা মানিক বড় হয়ে গেছে। এবার থেকে মাকে ছেড়ে থাকতে কোন কষ্ট হবে না। অর্ণব শক্ত করে মায়ের একহাত চেপে ধরেছিল। অতিকষ্টে চোখের জল সংবরণ করল। নীলা ছেলের মাথা বুকের সাথে চেপে ধরল ।

অর্ণবকে স্কুলে রেখে আসার পরদিন সকালবেলায় নীলা একটা স্যুটকেসে তার কিছু কাপড়চোপড় আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। নীলোৎপল বসে চা খাচ্ছিল। আলমারির চাবি দিয়ে বলল

> আমি চলে যাচ্ছি ।
> মানেটা কী?
> মানে আবার কী? এই বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আরও আগেই চলে যেতাম। বাবুই যেহেতু হোস্টেলে চলে যাবে তাই রয়ে গেলাম এই কয়টা দিন।

হঠাৎ নীলোৎপল ভাঙ্গায় গলায় বলে উঠল

>নীলা আমাকে ক্ষমা করে দাও। সেদিন আমার এভাবে বলা উচিৎ হয়নি। আমি আর কখনও তোমাকে
নীলা থামিয়ে দিয়ে বলল
> তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। আমি যে একজন আলাদা সত্ত্বার মানুষ সেটিই ভুলতে বসেছিলাম। এই অপমানের পরে আর সম্ভব নয়

> নীলু আমি তো আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি আর কখনও… আর তাছাড়া বাবুই ছুটিতে এসে যখন তোমাকে দেখতে পাবে না… নীলোৎপল শেষ অস্ত্র বের করল।
> বলে দিও তুমি ওকে আমার সম্পর্কে যা জান … তুমি তো অনেক কিছুই জান…
নীলু আর একবার ভেবে দেখলে হতো না?
নীলা যেন অনেক দূর থেকে বলল….হয়তো বা হত। কিন্তু তাহলে যে আমার ‘আমি ‘র কোন অস্তিত্ব থাকে না। ওটা ছাড়া যে আমি বিগ জিরো…. নীলোৎপল কী বুঝল কে জানে! আর কথা বাড়াল না।

আজ কত বৎসর হয়ে গেল নীলা এই ছোট শহরের মিশনারী হাসপাতালে কাজ নিয়ে চলে এসেছে। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো বাবুই এর কথা ভেবে। কতরাত নির্ঘুম কাটিয়েছে। কত রাত চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছে। কিন্তু যখনই নীলোৎপলের কথাগুলো মনে পড়ত, নীলার মনে হতো ঘন্টার পর ঘন্টা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। তাতেও যেন ওর গা থেকে ক্লেদাক্তকর নোংরাগুলো ধুয়ে যাবে না৷ ওর গায়ের জ্বলুনি জুড়োবে না। আজ বাবুই অনেক বড় হয়েছে। বুয়েটে পড়ছে। ছুটিতে এসে মায়ের সাথে দিন কয়েক কাটিয়ে যায়। কিন্তু ভুলেও বলে না মা ফিরে চলো। অতীত নিয়ে দুজনের কেউই কথা বলে না। একজন না জানতে চায় তার একদা স্বামীর কথা! আর একজন সন্তর্পণে এড়িয়ে যায় তার জন্মদাত্রীর কাছে জন্মদাতার কথা। কী বিচিত্র এই পৃথিবী! কী বিচিত্র মানব চরিত্র!! একটু পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে জীবন এত জটিল হতো না। দিনে দিনে আরও জটিলতার দিকে এগোচ্ছি অথবা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সারমেয়র জীবন যাপন করতে চলেছি।

#জীবন বড় জটিল

#অঞ্জনা দত্তআমার মন কেমন করে,
কে জানে, কে জানে, কে জানে, কাহার তরে… ‘ এমন অনুভূতির সন্মুখীন মনে হয় কমবেশি সবাই হয়। কেন মানুষের মনের স্থিরতা নেই? সবার কথা বলছি না৷ তবে যারা এমন মানসিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন, সেখানে কিছু না কিছু সমস্যা অবশ্যই আছে। আর সেটি যে শুধুই পরকীয়ার কারণে তা ভাবলে হয়তো বা এই আপাত নিঃসঙ্গ মানুষটির প্রতি অবিচার করা হবে। তাহলে কেন তার মন ‘কেমন করবে ‘? কিসের অভাব? জীবনসঙ্গীর অবহেলা? অসম্মান? এটি একটি পয়েন্ট হতে পারে। কেননা আমাদের সমাজে স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হয় এটি কমজনই বোঝে। স্বামী অর্থ হলো প্রভু৷ কাজেই সে এই নিয়ে ভাববেই না৷ তদুপরি জ্ঞান হওয়া পর্যন্ত সে দেখে এসেছে মায়ের ওপর বাবা ছড়ি ঘোরাচ্ছে, বড়ভাই ছোট বোনের ওপর… তাহলে একজন পুরুষ যখন স্বামীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখন সেও হয়ে ওঠে কোন একজনের দন্ডমুন্ডের কর্তা! সে কখনোই ভাবে না একটি সংসার সুন্দর করতে হলে স্বামী স্ত্রী দুজনেরই সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। শুধুমাত্র সমাজের কাছে পরিচয় দেয়ার জন্য শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করা নয়, সেই মেয়েকে তার শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশে সহায়তা করা একজন আধুনিক এবং মার্জিত রুচির স্বামীর উচিৎ।

আজ নীলার হয়েছেটা কী? সব কাজ ফেলে সমাজ নিয়ে ভাবতে বসেছে? সে একা এই পচনশীল সমাজের পরিবর্তন কতটুকু করতে পারবে? যে সমাজ একদা নারীদের স্বামী মারা গেলে তার সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করত, যে সমাজ নারী স্বামী হারালে তার চলাফেরা, খাওয়া দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করত, যে সমাজ শিশুমেয়েকে তার পিতার জাতকুলমান রক্ষার্থে শিশুটির চেয়ে ৫০ -৬০ বছরের ব্যবধানে, এমনকী অনেক সময় ঘাটের মড়ার সাথেও বিয়ে দিতে পিছপাও হতো না, সে সমাজের অনেক কিছু বদলে গেলেও সমাজপতিদের অর্থাৎ পুরুষদের মন কতটুকু বদলেছে? পুরুষরা আজও ভাবে নারী তার অধীনস্থ এক প্রাণী বটে। সে যা বলবে নারীকে তাই মেনে চলতে হবে। নারীর নিজস্ব কোন চিন্তাভাবনা, মতাদর্শ থাকতে পারে না। কোন নারীর আচরণে পুরুষের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বা ভিন্ন কিছু দেখা দিলে সেটি নিয়ে নারীকে কী জবাবদিহিতা করতে হয় না? কিন্তু কয়জন নারী পারে তার দৃষ্টিতে তার স্বামীর কোন অসঙ্গত আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করতে? কীসব সৃষ্টিছাড়া চিন্তাভাবনা নীলার?? কেন এমন হয়? তাহলে কী আসলেই নারী শিক্ষা দায়ী এজন্য? নারীদের কী শিক্ষার প্রয়োজন ছিল না? নারীদের কী উচিৎ ছিল পড়ে পড়ে মার খাওয়া! কে জানে! নীলা ভাবে আর ভাবে! কোন সদুত্তর পায় না।

তার মনে পড়ে আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতার কথা। যাকে তার পুরো জীবনে ছোট মেয়েটি ছাড়া আর কেউ বোঝেনি৷ তার এতগুলো সন্তান ছিল। তার শরীরে তিলতিল করে বেড়ে ওঠা তার আত্মজরাও যখন তাকে বুঝতে পারত না, বাপ কাকুদের সঙ্গে মায়ের সমালোচনা করতে ছাড়ত না, তখন সুবর্ণলতার বুক ভেঙ্গে যেত৷ সুবর্ণলতার স্বামীর কাছে সুবর্ণ’র শরীরের দাম ছিল। আর কিছু নয়। কখনও জানতে চায়নি সুবর্ণ কী চায়? কীসে সে খুশি হয়? কীসে তার দুঃখ? সে পর্যন্ত ভাবার মত সুবর্ণলতার স্বামীর, বলতে কী, মস্তিষ্কের কোষগুলো কাজও করত না। ঐ বাড়িতে সুবর্ণলতা ছিল সৃষ্টিছাড়া৷ তার মত করে কেউ ভাবত না। ভাবতে পারত না৷ সুবর্ণের মা সত্যবতীর কষ্ট ছিল আরও গভীর। তার স্বামীটি ছিল বৌ অন্ত প্রাণ। কিন্তু নিজের মায়ের বিপক্ষে যাওয়ার মত ক্ষমতা তার ছিল না।, সে কারণটা ন্যায্য হলেও। তাই সত্যবতীও যখন দেখল তার শিক্ষার কোন দাম নেই তার সংসারে সত্যবতী সে সংসার ত্যাগ করে চলে যেতে দুবার ভাবেনি। সেই কোন আমলের কাহিনী। তখনো সত্যবতীর মত দৃঢ় চরিত্রের নারী ছিল এই সমাজে! সত্যবতী ভুল করেছিল কী ঠিক করেছিল সে অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু তার অপমানিত হৃদয়কে সে আর অপমানিত হতে দিতে চায়নি। তাই ছোট সুবর্ণকে, মনে হয় বছর আটেকের ছিল, ছেড়ে যেতে পেরেছিল অনায়াসে। এর আর একটি কারণ হলো ঐ শিশু সুবর্ণকে তার ঠাকুরমা বিয়ে দিয়েছিল। সেই বিয়ে সত্যবতীর স্বামী আটকাতে পারেনি। নিজের শাশুড়ির ওপর আস্থা সত্যবতীর কখনোই ছিল না। যেমন সুবর্ণলতা পায়নি কোনদিন শাশুড়ির ভালবাসা, মাতৃস্নেহ। সত্যবতী বুঝেছিল সুবর্ণকে সে যেভাবে মানুষ করতে চেয়েছিল, তা যখন হবার নয়, তাহলে সে সংসারে থেকে কী হবে? তাই অভিমানে সংসার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল।

আজকের দিনে সুবর্ণলতারা কেমন আছে? নীলা কপাল কুঁচকে ভাবতে থাকল৷ আজ অবশ্য মেয়েদের লেখাপড়া বেড়েছে। আজ মেয়েদের একটা ভাল অংশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বী। কিছুটা ভাবল নীলা এই কারণে যে অনেক মেয়েকে বেতনের টাকাটা স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়। নিজের প্রয়োজনীয় খরচের টাকাটা স্বামী নামক প্রভুর থেকে চেয়ে নিতে হয়। কোন কোন মেয়ের চাকরির বেতনে তার সংসার চলে। কাজেই অর্থনৈতিক মুক্তির কথা সে ভাবতে পারে না। এটি কী জিনিস সে জানেও না। নীলা ভাবে তারা যে চাকরি করে নিজের সংসারে অবদান রাখতে পারছে এটাই বা কম কী ! শুধু কষ্ট টা এখানে যে এই অবস্থায়ও বহু স্বামী স্ত্রীর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির টাকায় অসৎসঙ্গে কাটাতে দ্বিধাবোধ করে না। আর যারা সমাজের উচ্চবিত্ত আসনে আছেন, যাদের দুই চার পয়সার চাকরির ওপর নির্ভর করতে হয় না, তাদের নীলার ভাবনার ঘরে ঠাঁই হয় না। প্রয়োজন নেই কোন পক্ষেরই। আর যে মধ্যবিত্ত অংশের নারীরা নিজ যোগ্যতায়, বাবা মায়ের উৎসাহে লেখাপড়া শেষে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন তারাই বা কতটা ভাল আছেন? তারা কী সত্যবতী, সুবর্ণলতার গন্ডি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছেন? তারা কী তাদের সংসারে যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন? একেবারে পাচ্ছেন না সেটি নীলাও ভাবে না। তবে কত শতাংশ প্রশ্ন হলো সেখানে।

আমাদের দেশে কোন কিছুরই পরিসংখ্যান ঠিকমত নেই। সেখানে সমাজে নারীদের কী অবস্থা সেটি নিরূপণ করা কতটা সম্ভব? নীলার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছিল। এটি নীলার থিসিসের বিষয় নয়। লেখাপড়ার পাট তার অনেক আগেই চুকে গেছে। সাধারণ সংজ্ঞায় নীলা উচ্চশিক্ষিতা। তার সংসারে সে অনেক অর্থে অবহেলিত নয়। অনেকটাই সম্মান সে পায়। তবু কেন জানি তার অনেক সময় মনে হয় মেয়েরা লেখাপড়া কম শিখলে হয়তো বা ভাল ছিল৷ আপনারা শিক্ষিত নারীরা তেড়ে আসবেন না৷ নীলা বলতে চেয়েছে যেইমাত্র একজন নারী পড়াশোনা করছে, তখন সে তার নিজের মত করে ভাবতে শিখছে। সে তার ‘ আমিত্ব ‘ কে চিনতে শিখছে৷ আর তখনই শুরু হয় যত গোলমাল। অনেক শিক্ষিত নারী নিজের আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে প্রভুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছে। অনেকে আমিত্বকে পুরোপুরি বিসর্জন না দিয়ে মাঝামাঝি পথ বের করে নিয়ে চলে। তাতে সে কতটা ভাল আছে বা তার যতটুকু সম্মান প্রাপ্য ছিল ততটুকু পেয়েছে কি না তা নিয়ে ততটা মাথা ঘামায় না৷ মোটামুটি সংসারের চাকা সচল রয়েছে, তার চাহিদা পূরণ হচ্ছে। পূরণ হচ্ছে সন্তানদের চাহিদা। ভাল স্কুলে পড়ানো যাচ্ছে। স্বামী নামক প্রভু বৎসরে একবার দেশের বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে। কাজেই সংঘাত কোথায়? মাঝে মাঝে দুই এক কথায় কিছু কটু কথা চলে আসে বটে! তাতে কী? দুটো হাঁড়ি থালা পাশাপাশি থাকলে একটু কী ঠোক্কর খায় না? এটিও তেমন কিছু একটা৷ সব কিছু নিয়ে ধরে বসে থাকলে চলে? না বসে থাকা উচিৎ! একদম ঠিক। জীবন তাহলে সামনে এগোত না। পিছিয়েই থাকত৷

তাহলে দাঁড়াচ্ছেটা কী? সত্যবতী হওয়া অনেক কঠিন। সোজা কোনটাই বা? সুবর্ণলতা? নাকি দীপাবলি? ঘুরেফিরে অন্য উপন্যাসের নায়িকার নাম চলে আসে। নীলা বিরক্ত হলো নিজের ওপর? এই সমাজে মেয়েরা কেন নিজেদের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে না? কেন তাদের সব সময় কারও না কারও সঙ্গে তুলনীয় হতে হয়? একধরণের বেদনাবোধ নীলাকে সবসময় ক্ষতবিক্ষত করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দেখে! এখানটায় এসে নীলা একটু থমকালো। এত সংগ্রাম করলেন রাজা রামমোহন রায়। লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলেও যেতে হয়েছিল তাঁকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিয়ে নিয়ে এত লড়লেন, লড়েছেন নারীদের শিক্ষা নিয়ে। আজকের দিনে মেয়েরা নয় নয় করেও কম এগোয়নি। এরপরেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আছর যায়নি নারীদের ওপর থেকে৷ এখনও নারীরা মানুষ হিসাবে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে পারেনি। এখনও ভোগের বস্তু হয়ে রয়েছে। কী ঘরে, কী বাইরে। তাহলে মেয়েরা কখন স্বাধীন হবে? কখন তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে? প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী অর্জনই কী বড় স্বাধীনতা? আর কোন স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই? সংসারে কোন ব্যাপারে তার কোন মতামত থাকতে নেই? তাকে সবকিছুতে শুধু হ্যাঁ বলে যেতে হবে? এমনকী নিজের সন্তানের বিষয় হলেও একজন মায়ের কোন বক্তব্য থাকতে পারে না? এটি মেনে নেয়া যায়? নেয়া উচিৎ? এতবড় অপমান যে নীলা হজম করতে পারল না। নিমিষে নীলা হয়ে গেল সত্যবতী!

কিন্তু এই যুগে যে সত্যবতী হওয়া যায় না। এযুগে হয় পড়ে পড়ে মুখ বুজে অপমান সয়ে যাও , অথবা দীপাবলি হয়ে যাও। আর যে সব পুরুষের আপাদমস্তক গুবরে পোকায় কিলবিল করছে ওরা বলবে ওঃ! ইনি? ইনি তো তসলিমা নাসরিন! হায়রে সমাজ!! নীলা সেদিকে গেল না। তবে ওর মাথায় দীপাবলি জেঁকে বসেছে। আজ বেশকিছুদিন ধরেই। কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না৷ আচ্ছা আমাদের দেশে দীপাবলিদের সংখ্যা কী নেহাৎ কম? মোটেও নয়। দিনে দিনে দীপাবলিদের সংখ্যা বাড়ছে। একটি মেয়ে নিজেকে যত বেশি জানছে দীপাদের সংখ্যা তত বাড়ছে। তবে উপন্যাসের দীপাবলি আর বাস্তবের দীপাবলিদের অনেক পার্থক্য। উপন্যাসের দীপাবলিকেও ফাইট করে চলতে হয় পারিপার্শ্বিকতার সাথে। আর রক্তমাংসের দীপাদের গায়ে অহরহ এসে বিঁধে যত তীর্যক চাহনি। নোংরা কমেন্টস চতুর্দিক থেকে… সবাই মনে করে স্বামীহীনা নারীর ওপর ওদের সবার অধিকার রয়েছে। কেমন অসহায় লাগে তখন নিজেকে… ফাইট করার এনার্জি আর থাকে না। যারা বলছে তারা খুব ভাল করেই জানে নীলা কেমন মেয়ে! কী তার জীবন যাপন সবই জানে। কিন্তু নোংরামি ছড়াতে বাধে না। এই সমাজ দীপাবলিদের স্বাধীনভাবে একা থাকতে দেয় না৷ এই সমাজ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন দীপাবলিদের সহ্য করতে পারে না। মেয়েদের এত তেজ কীসের? এই কথা যেমন একজন পুরুষ বলে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন নারীও বলবে অন্য নারী সম্পর্কে না জেনে।

নীলোৎপল যে রাতে ক্লাব থেকে এসে ঘোষণা দিল ছেলে অর্ণবকে ক্যাডেট কলেজে পাঠিয়ে দেবে, নীলার মনে হলো তার পায়ের নিচের মাটি দুলে উঠল। নীলার মাথা ঘুরিয়ে উঠল। অর্ণব মাত্র ক্লাস সেভেনে ৷ ক্যাডেট কলেজ সম্পর্কে কত রকমের কথা শোনা যায়। যদি সেগুলো সত্যি নাও হয়, ছেলেকে ক্যাডেট কলেজে দেয়ার কী আছে? ঢাকায় তো ভাল স্কুলের অভাব নেই। নীলা প্রথমটায় ভাবল ক্লাব থেকে এসেছে। এখন মাথা ভাল কাজ করছে না। পরদিন কথা বলে নেবে। ছেলেকে ক্যাডেট কলেজে দেয়ার কথা যে নীলোৎপল ভাবছে নীলা তো আগে কখনও শোনেনি৷ কখনও বলেনি তো! তাই পরদিন ব্রেকফাস্ট করার সময় নীলা ধীরেসুস্থে জিজ্ঞেস করল কাল রাতে যেন কী বলেছিলে বাবুইকে ক্যাডেট কলেজে পাঠাবে…
> হুম। বলেছি তো।
> কেন? এখানকার স্কুলে কী সমস্যা হচ্ছে? অন্য বাচ্চারা পড়ছে না?
> পড়ছে। ওদের মায়েরা দেখছে বাচ্চাকে। খোঁজখবর রাখছে। ওরা তো তোমার মত সেজেগুজে বসের মন যোগাতে রোজ সকালে ঘর থেকে বাইরে যাচ্ছে না?
নীলা চমকে উঠল নীলোৎপলের কথায়। নীল জানে নীলা একজন চিকিৎসক। একটি সরকারি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপিকা। নীল এমন কথা উচ্চারণ করতে পারল? কাল রাতের ক্লাবে যে ছাইপাঁশ গিলে এসেছে তার ক্রিয়া এখনও চলছে?
> কী বললে তুমি? এত নোংরা তোমার মন? বিয়ের আগে তুমি জানতে না আমার প্রফেশন কী?
> জানব না কেন? তবে তুমি আমার ভালমানুষির সুযোগ নেবে তা বুঝিনি৷ আর আমি বললেই নোংরা৷ তুমি করলে কোন দোষ নেই।
> তুমি ভেবে বলছ? বুঝে বলছ?
> এতে এত ভাবাভাবির কী আছে? চারপাশে দেখছি না!
নীলার রুচিতে কুলাল না আর কিছু বলতে। নীলা কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছে নীলার সম্পর্কে নীলের কথাবার্তা বদলে যাচ্ছে । রাতের সম্পর্কে যেন জানোয়ার ভর করে ওর ওপর৷ নীল তো এমন ছিল না? হয়েছে টা কী? বার কয়েক কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু নীলোৎপলই এড়িয়ে গেছে৷ ক্লাবে যাওয়া বেড়ে গিয়েছে। নীলা নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়েছে। আগে যেখানে ঘন্টা তিনেক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করত, এখন সেটা কমিয়ে এনেছে। সেটা যে নীলকে খুশি করার জন্য তা নয়। লজ্জায়, ঘেন্নায় নীলা বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিৎ! ঐ রাতের পর থেকে সে ছেলের ঘরে ঘুমাতে শুরু করেছে৷ ছেলে অবাক হয়েছে। খুশিও হয়েছে। বাপী ঠিক করেছে ওকে ক্যাডেট কলেজে পাঠিয়ে দেবে। ওর একেবারেই ইচ্ছে নেই। কিন্তু সাহস করে বলতেও পারছে না। আর নীলা দিন গুনছে অর্ণব কবে চলে যাবে হোস্টেলে।

ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষায় অর্ণব ভাল করেছে। ওকে রেখে আসতে হবে। নীলা সেদিন ছুটি নিয়েছে। ছেলের সাথে যাবে। নীলকে সেদিন কেমন যেন গম্ভীর দেখাচ্ছিল৷ আর নীলা হেসে হেসে অর্ণবের মাথার চুল এলোমেলো করে দিতে দিতে বলল আমার সোনা মানিক বড় হয়ে গেছে। এবার থেকে মাকে ছেড়ে থাকতে কোন কষ্ট হবে না। অর্ণব শক্ত করে মায়ের একহাত চেপে ধরেছিল। অতিকষ্টে চোখের জল সংবরণ করল। নীলা ছেলের মাথা বুকের সাথে চেপে ধরল ।

অর্ণবকে স্কুলে রেখে আসার পরদিন সকালবেলায় নীলা একটা স্যুটকেসে তার কিছু কাপড়চোপড় আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। নীলোৎপল বসে চা খাচ্ছিল। আলমারির চাবি দিয়ে বলল

> আমি চলে যাচ্ছি ।
> মানেটা কী?
> মানে আবার কী? এই বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আরও আগেই চলে যেতাম। বাবুই যেহেতু হোস্টেলে চলে যাবে তাই রয়ে গেলাম এই কয়টা দিন।

হঠাৎ নীলোৎপল ভাঙ্গায় গলায় বলে উঠল

>নীলা আমাকে ক্ষমা করে দাও। সেদিন আমার এভাবে বলা উচিৎ হয়নি। আমি আর কখনও তোমাকে
নীলা থামিয়ে দিয়ে বলল
> তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। আমি যে একজন আলাদা সত্ত্বার মানুষ সেটিই ভুলতে বসেছিলাম। এই অপমানের পরে আর সম্ভব নয়

> নীলু আমি তো আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি আর কখনও… আর তাছাড়া বাবুই ছুটিতে এসে যখন তোমাকে দেখতে পাবে না… নীলোৎপল শেষ অস্ত্র বের করল।
> বলে দিও তুমি ওকে আমার সম্পর্কে যা জান … তুমি তো অনেক কিছুই জান…
নীলু আর একবার ভেবে দেখলে হতো না?
নীলা যেন অনেক দূর থেকে বলল….হয়তো বা হত। কিন্তু তাহলে যে আমার ‘আমি ‘র কোন অস্তিত্ব থাকে না। ওটা ছাড়া যে আমি বিগ জিরো…. নীলোৎপল কী বুঝল কে জানে! আর কথা বাড়াল না।

আজ কত বৎসর হয়ে গেল নীলা এই ছোট শহরের মিশনারী হাসপাতালে কাজ নিয়ে চলে এসেছে। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো বাবুই এর কথা ভেবে। কতরাত নির্ঘুম কাটিয়েছে। কত রাত চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছে। কিন্তু যখনই নীলোৎপলের কথাগুলো মনে পড়ত, নীলার মনে হতো ঘন্টার পর ঘন্টা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। তাতেও যেন ওর গা থেকে ক্লেদাক্তকর নোংরাগুলো ধুয়ে যাবে না৷ ওর গায়ের জ্বলুনি জুড়োবে না। আজ বাবুই অনেক বড় হয়েছে। বুয়েটে পড়ছে। ছুটিতে এসে মায়ের সাথে দিন কয়েক কাটিয়ে যায়। কিন্তু ভুলেও বলে না মা ফিরে চলো। অতীত নিয়ে দুজনের কেউই কথা বলে না। একজন না জানতে চায় তার একদা স্বামীর কথা! আর একজন সন্তর্পণে এড়িয়ে যায় তার জন্মদাত্রীর কাছে জন্মদাতার কথা। কী বিচিত্র এই পৃথিবী! কী বিচিত্র মানব চরিত্র!! একটু পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে জীবন এত জটিল হতো না। দিনে দিনে আরও জটিলতার দিকে এগোচ্ছি অথবা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সারমেয়র জীবন যাপন করতে চলেছি।

#জীবন বড় জটিল

অঞ্জনা দত্তের ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

স্মৃতির মুকুরে

অঞ্জনা দত্ত: অনেক বৎসর পর ডঃ সবিতা চৌধুরী নিজ দেশে ফিরলেন৷ সকাল থেকে অঝোর ধারায় ...