Home / ফেইসবুক কর্নার / অরিত্রী, তুই ভাল থাকিস মা!

অরিত্রী, তুই ভাল থাকিস মা!

মাত্র ১০০ ঘণ্টা আগেও একটি সতেজ ফুল বৃন্তচ্যুত হবার অনেক আগেই ঝরে গেল। ঝরে গেলো শব্দটি বেমানান বরং বলা চলে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দেয়া হলো। বলছিলাম অরিত্রীর কথা। কোনো মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত। অরিত্রীর তো মৃত্যু হয়নি বরং মৃত্যুকে কাছে আনার জন্য আমরা সবকিছুর আয়োজন তার সামনে এনে তুলে ধরেছি। হ্যা আমরাই, এখানে একক কেউ নেই। আমরা সংঘবদ্ধচক্র। আমি মা-বাবা তারা। তাঁরা শিক্ষক এবং এই শিক্ষাব্যবস্থা। একক কেউ দায়ী নয়। তবে সম্মিলিত সবার মধ্য থেকে ভিলেন হয়ে দাম্ভিকতায় নিজেদের দাপট দেখিয়ে দিলেন তার দ্বিতীয় জন্ম হবার সেই আলোকিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-ভিকারুননিসা স্কুল এন্ড কলেজ। তবে গলা ফাটিয়ে একটি বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা নেহায়েত বোকামি বলেও আমার কাছে মনে হয়। প্রতিবছরেই গোচরে এবং অগোচরে এমনি অরিত্রীরা ঝরে যাচ্ছে। আত্মাহুতি দিয়ে যাচ্ছে। চিত্রটি বেশি দেখা যায় কোনো পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার পর। দেখা যায়, ফলাফল ভালো করার জন্য বাবা-মা-ফুফু-খালা-মামার দল ‘ভি’ চিহ্নিত দুই আঙুল উঁচিয়ে সবাই যেন আলেকজেন্ডার দি গ্রেট হয়ে যান! মেয়েটি বা ছেলেটি নয়, যেন গোটা পরিবার হিমালয়ের শীর্ষে উঠে গেছে। ঠিক বিপরীত চিত্র, যে কারণেই হোক, পরীক্ষা নামক বৈতরণী পার হতে পারেনি যে, সে বাড়িতে চলে শোকের মাতম এবং পরিবারের সকলের ভ্রুকুটি এবং ধিক্কার। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, মেয়েটির মানসিক অবস্থা। সেই সাথে বয়ঃসন্ধিক্ষণের জটিল মানসিকতার উপসর্গ-উপকরণগুলো। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো-মন্দের যে মাপকাঠি, তা বড্ড হাস্যকর। সেই সাথে আছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ভালো স্কুল থেকে ভাল রেজাল্টের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। শুরুটা তথাকথিত নামী-দামি স্কুলে ভর্তির জন্য অভিভাবকদের একধরনের বড়াই আর নোংরা মনোস্তাত্ত্বিক প্রত্যাশা শিশুকে কিশোর হবার আগেই সর্বনাশের প্রথম ধাপে এগিয়ে দেয়। নামী ও দামি তাদের কাছে এক ধরনের সামাজিক স্ট্যাটাস। এর ভূত ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় জন্মগত একটি নিরীহ নিষ্পাপ শিশুর ওপর। ব্যাস, হয়ে গেলো আধুনিক বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন মাধ্যমের বাণিজ্য। দেশের প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামে বাণিজ্যব্যবসায় লাভবান একধরনের শিক্ষায়তনের কিছু মুনাফাখোর শিক্ষক। অন্যদিকে সামাজিক স্ট্যাটাসের বিকৃত মনের অভিভাবকের কারণে প্রচণ্ড ক্ষতি হচ্ছে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের।

এবার আসি মূল বিষয়ে। আলোচিত অরিত্রীর আত্মহত্যার বিষয়টির অন্যতম দোষী স্কুল ভিকারুননিসা স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কেউই এ দায় এড়াতে পারেন না। যে কোনো সভ্য শিক্ষিত মানুষের জানা আছে যে, বয়োসন্ধিক্ষণের বয়সটা কতো মারাত্মক। আমাদের দেশের মেয়েদের বিষয়টি আরও বেশি সেনসিটিভ। চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থেকে নানারকম বিধিনিষেধের বেড়াজলে আটকে কতোটা প্রতিকূল অবস্থায় মেয়েটি বেড়ে ওঠে এবং পরিবারে-অভিভাবকের কোচিং কোচিং খেলায় নাস্তানাবুদ হয়ে থাকে। ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া, ঘোরা, খেলাধুলা—কোনো কিছুরই সময় নেই। এরপরও তারা পরিবারের স্ট্যাটাস সিম্বলের শিকার। উল্লিখিত নামীদামি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নামে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়, তাদের অধিকাংশের সার্টিফিকেট অনেক ভারি কিন্তু এরা প্রায়শ রামগড়ুরের ছানা। এরা হাসতে জানে না, হাসাতে জানে না; শুধু লেখাপড়ার নামে বিরাট জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দিতে পারে। সাথে থাকে এঁদের অহেতুক ব্যক্তিত্বের খোলস। অর্থাৎ একজন বন্ধু শিক্ষক হবার যোগ্যতা এঁদের অধিকাংশের মধ্যে নেই। উন্নত বিশ্বেও এই ধরনের স্কুলগুলোতে পরীক্ষাব্যবস্থা থাকলেও এমন ভালো-মন্দের অসুস্থ প্রতিযোগিতা সেখানে নেই, নেই লোকদেখানো উন্নাসিক কালচার। স্কুলের পাঠে অমনোযোগী অথবা বিষয়গত কোনো দুর্বলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক একান্ত আলোচনার মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে উপরের ক্লাশের শিক্ষকের সাথে কিংবা রেক্টর, এমনকি প্রধান শিক্ষকের সাথে এবং অভিভাকদের সাথে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু এখানে তা নেই। বাইরের প্রতিটি স্কুলেই থাকে শিক্ষকসম মনঃস্থাত্ত্বিক। এঁরা পারস্পরিক কাউন্সিলিং করে ছাত্র-ছাত্রীদের আসল দুর্বলতা বের করে সমাধান দেন। অথচ দুর্ভাগ্য আমাদের দেশের যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নামক এই আজব চিড়িয়াখানাগুলোয় এমন ব্যবস্থা নেই। এদের মধ্যে সেই মানসিকতা গড়ে ওঠেনি। বরং চোর-পুলিশের মতো মার খাওয়ানোর কালচার দেখা যায় এদের মধ্যে। অরিত্রীর বাবা মা এবং অরিত্রীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এখানে আসামি অরিত্রী আর তার অভিভাবক। থানার দারোগারূপে স্বয়ং প্রিন্সিপাল এবং সাথে তার পাইক-পেয়াদা পুলিশ ও আরো প্রহরী।

আমি এমনি একজন অভিভাবক এবং একই স্কুলে বেশ কয়েক বছর আমার মেয়েটি লেখাপড়া করে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবতী বলতে পারছি না। কারণ আমার ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারতো। ভাবতে গা শিউরে ওঠে। খুব কাছ থেকে দেখেছি, এধরনের স্কুলের পরিচালনা পরিষদের খাম-খেয়ালি। পরিশেষে বলতে চাই, অরিত্রী আত্মহুতি দেয়নি বরং আত্মত্যাগ করে সমাজকে দেখিয়ে দিয়ে গেছে যে অরিত্রীরা মরে না বরং আগামীর শত শত অরিত্রীর জন্য সুগম সুন্দর ও সাবলীল জীবনের পথ দেখিয়ে যায়।

আমি শত-সহস্র সালাম জানাই অরিত্রীর বিদেহী আত্মার প্রতি। কারণ আমিও একজন মা হয়ে এমন অরিত্রীর জন্য কাঁদতে চাই। কাঁদতে চাই ততোদিন, যতোদিন না সকল অরিত্রীর মুখে হাসি ফোটে। অরিত্রী, তুই ভাল থাকিস মা!

লেখক :. মাহাবুবা লাকি, কবি ও সমাজকর্মী।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Number of Visitors

4.com/wp-content/plugins/xt-visitor-counter/styles/image/web/2.gif' alt='2'>4.com/wp-content/plugins/xt-visitor-counter/styles/image/web/0.gif' alt='0'>4.com/wp-content/plugins/xt-visitor-counter/styles/image/web/2.gif' alt='2'>8989
Users Today : 534
x

Check Also

ডন

ভাবনা ক্লাব সিলেটে-১

আজিজুস সামাদ ডন: সেদিন ভাবনা ক্লাবে যেয়ে দেখি অস্থির ব্যাপার স্যাপার। সবাই খুব উত্তেজিত। কেউ ...